ইরানিদের মধ্যে এক চাপা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে

আপলোড সময় : ০১-০২-২০২৬ , আপডেট সময় : ০১-০২-২০২৬
গত ৩০ জানুয়ারি রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে ইরানিদের মধ্যে এক চাপা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গুজব ছড়িয়ে যায়, যেকোনো মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হামলা চালাবে। আর এই আশঙ্কা এখনো ইরানের জনগণের মধ্যে রয়ে গেছে। যদিও আলোচনার ব্যবস্থা চলছে বলে জানিয়েছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। তারপরও ইরানিরা নিজেদের জানালাগুলো শক্তভাবে বন্ধ করে দিচ্ছেন, প্রয়োজনীয় খাবার ও পানি মজুত করে রাখছেন।

মিলাদ ছদ্মনামে তেহরানের বাসিন্দা ৪৩ বছর বয়সী প্রকৌশলী বলেন, ‘আমি শুধু অপেক্ষা করছিলাম, কখন আঘাতটা আসবে। সকাল পর্যন্ত ঘুমাতে পারিনি। বারবার জেগে উঠছিলাম, বিস্ফোরণের কোনো শব্দ শুনি কি না, সেটাই কান পেতে শুনছিলাম। আজ রাতে কী হয়, দেখা যাক।’ ৬৮ বছর বয়সী শোহরেহ বলেন, ‘আজ (৩০ জানুয়ারি রাতে) আমার সব বন্ধুই বলছিল, আজ রাতেই আঘাত আসবে।’

শোহরেহ ইরানে বিদেশি হামলার বিরোধী। তিনি বলেন, মানুষের আচরণ দেখে মনে হচ্ছিল, সবাই যেন মানসিক ভারসাম্য হারাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘ওরা ভাবছে, যুক্তরাষ্ট্র হামলা করলে সব ঠিক হয়ে যাবে। ইসলামিক রিপাবলিক যে হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে, তাতে মানুষ ভীষণ হতাশ হয়ে পড়েছে। তারা আর বুঝতে পারছে না কোনটা তাদের পক্ষে, আর কোনটা তাদের বিপক্ষে।’

এক সপ্তাহ ধরে ওয়াশিংটন আবারও ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঢাক পেটাচ্ছে। এর ফলে সংঘাতের আশঙ্কা ইরানিদের কাছে বাস্তব ও তাৎক্ষণিক ভয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক বহর মোতায়েন শুধু সৌদি আরব ও ইসরায়েলের সঙ্গে নতুন করে বহু বিলিয়ন ডলারের অস্ত্রচুক্তির পথই খুলে দেয়নি; ইরানিদের জন্য এটি নিয়ে এসেছে বিভ্রান্তি, মানসিক চাপ এবং এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের আশঙ্কা।

সরকারি কর্মচারী ৩২ বছর বয়সী আরজু মানুষের মধ্যে থাকা এক নীরব উদ্বেগের কথা বলেন। অনেকে যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ দিকগুলো নিয়ে কথা এড়িয়ে চলছেন, যেগুলো গত গ্রীষ্মে ইসরায়েলের সঙ্গে হওয়া ভয়ংকর যুদ্ধের কারণে সবারই চেনা। সবাই শান্ত থাকার চেষ্টা করছে। কিন্তু সবাই অপেক্ষা করছে প্রথম বিস্ফোরণের। তিনি বলেন, ‘আমার বাসার সামনে যে ভবন, সেখানে থাকা আমার এক প্রতিবেশী তার জানালা বন্ধ করে দিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সে বলেছে, ‘জানালা বন্ধ করে দাও। বোমা পড়লে তখন শাসক আর বিরোধীর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না।’

বিক্ষোভ দমনের সময় তিন সপ্তাহের ইন্টারনেট বন্ধ থাকার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আবার চালু হয়েছে। এখন সেখানে ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা হামলা থেকে বাঁচার নানা পরামর্শ ছড়িয়ে পড়ছে। পরামর্শের তালিকা দীর্ঘ—১০ দিনের খাবার ও পানি মজুত রাখা; হাতের কাছে প্রাথমিক চিকিৎসার বাক্স রাখা; পরিচয়পত্র ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দ্রুত নেওয়ার জন্য একটি ব্যাগে রাখা; জরুরি বের হওয়ার পথ খোলা রাখা; বিস্ফোরণের শব্দ শুনলে খোলা জায়গায় চলে যাওয়া; দেয়ালের পাশে মাটিতে শুয়ে পড়া। ফারসি ভাষার প্ল্যাটফর্মগুলোতে এমন আরও অসংখ্য নির্দেশনা ঘুরে বেড়াচ্ছে।

এই পরামর্শগুলোর উৎস অনেক সময়ই স্পষ্ট নয়। জুনে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সময় যেসব বট সক্রিয় ছিল, যারা ক্ষমতাচ্যুত শাহের ছেলে রেজা পাহলভিকে প্রচার করছিল, তারাই কি এর পেছনে আছে, সেটাও জানা যায়নি। তবে যে-ই থাকুক, এসব বার্তার প্রভাব স্পষ্ট। আরজু বলেন, তিনি এসব বার্তা দেখেছেন এবং ‘যদি কিছু হয়’ এই ভেবে ঘরে ১০ বোতল পানি ও কয়েক ক্যান খাবার রেখে দিয়েছেন।

৭৫ বছর বয়সী আমিন নামে এক কিডনি রোগী জানান, তিনি গত সপ্তাহে তিন মাসের ওষুধ কিনে এনেছেন এবং সেগুলো বাড়িতে রেখে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এই পরামর্শগুলোর কিছু হয়তো মিডিয়ার কারসাজি। তবু সাবধানতার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে রেখেছি। আগামীকাল কী হবে, কেউ জানে না।’ আমিন ইরান-ইরাক আট বছরের যুদ্ধ এবং গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধ—দুটোই দেখেছেন। নিজের দেশকে আবারও যুদ্ধের মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত।

এই ভয় আর প্রস্তুতি শুধু ইরানের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৪০ লাখ ইরানি প্রবাসীর মধ্যেও একই আশঙ্কা কাজ করছে। অনেকে ভয় পাচ্ছেন, আবারও দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে, যেমনটা ১২ দিনের যুদ্ধ ও গত মাসের দমনপীড়নের সময় হয়েছিল। ফলে তাঁরা স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ হারাবেন। তাঁরা নিজেদের পরিবারের জীবন নিয়েও উদ্বিগ্ন।

ইরানজুড়ে শহরগুলো এখনো তুলনামূলক শান্ত, অন্তত আপাতত। পেট্রলপাম্পে লম্বা লাইন নেই। দোকানপাট খোলা। মানুষ স্বাভাবিকভাবে কাজে যাচ্ছে। ভোরবেলা স্কুলপড়ুয়া শিশুরা স্কুলবাসের অপেক্ষায় বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। তবু আতঙ্কের অনুভূতি সর্বত্র।

২৭ বছর বয়সী ছাত্র সোরুশ বলেন, ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র থেকে বাঁচতে যুদ্ধের সময় তিনি পরিবারসহ উত্তর ইরানের এক শহরে চলে গিয়েছিলেন। তাঁর মতে, সেই সময়কার প্রকাশ্য আতঙ্ক এখন আর নেই, কিন্তু নতুন যুদ্ধের ভয় প্রতিদিনের কথাবার্তায় ঘুরেফিরে আসছে। তিনি বলেন, ‘১২ দিনের যুদ্ধের মতো সামষ্টিক আতঙ্ক এখন নেই। মনে হয় মানুষ মানসিকভাবে প্রস্তুত। ইসরায়েলি হামলার আগে আমরা জানতামই না, যুদ্ধ কেমন হয়। এখন আমাদের সামনে একটা ছবি আছে। আমরা জানি, আমাদের কী মুখোমুখি হতে হবে।’

সোরুশের মনে হয়, ইরানিদের জীবন এখন দেশের শাসকগোষ্ঠী আর পশ্চিমা শক্তিগুলোর কাছে একধরনের খেলা হয়ে গেছে। তিনি পলিমার্কেট নামের এক বেটিং ওয়েবসাইটের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে অনেকে ৩১ জানুয়ারি রাতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা হবে কি না, তা নিয়ে হাজার হাজার ডলার বাজি ধরেছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের জীবন আর মৃত্যু এখন বিনোদন। অন্যদের জন্য একধরনের খেলা।’

৪১ বছর বয়সী সাবা তাঁর আট বছরের মেয়ে ও ১২ বছরের ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়ের কথা বলেন। একই সঙ্গে তিনি সরকারের দমননীতি, বিদেশে থাকা বিরোধী নেতাদের আত্মস্বার্থ এবং যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধোন্মাদনা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা কতই না দুর্ভাগা এক জাতি। আমাদের শাসকেরা রাস্তায় মানুষ হত্যা করে। রেজা পাহলভি বিদেশে আমাদের বিরোধিতার মুখ হয়ে উঠেছে। আর আমাদের শত্রু ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো এক বোকা।’

তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট আই 

সম্পাদকীয় :

Editor and Publisher-    Muhammad Nurul Islam

Executive Editor-  Kazi Habibur Rahman.  Managing Editor -  Eng. Mohammed Nazim Uddin
Head Office: Paris, State: Île-de-France
Dhaka office : House No-421 (1st Floor), Road No- 30, New DOHS, Mohakhali, Dhaka. Bangladesh.

Email: editor.eurobarta@gmail.com.

www.eurobarta.com সকল অধিকার সংরক্ষিত 

অফিস :