২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ , ১৫ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নরসিংদীর মাধবদী: একটি কিশোরীর মৃত্যু, একটি রাষ্ট্রের পরীক্ষা

আপলোড সময় : ২৭-০২-২০২৬
নরসিংদীর মাধবদী: একটি কিশোরীর মৃত্যু, একটি রাষ্ট্রের পরীক্ষা

আহমেদ সোহেল (বাপ্পী), প্যারিস

খোলা আকাশে ফুটফুটে মোরগের বাচ্চাদের যেভাবে হিংস্র চিল ঝাঁপিয়ে নিয়ে যায়, নরসিংদীর মাধবদীতে ঠিক সেভাবেই মানুষের সামনে থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে এক কিশোরীকে। নাম তার আমেনা আক্তার। বয়স মাত্র ১৫।
এই মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের শোক নয়। এটি আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ এবং বিবেকের সামনে এক নির্মম প্রশ্নচিহ্ন।


নরসিংদী জেলার মাধবদীতে সরিষার ক্ষেতে পড়ে থাকা এক কিশোরীর লাশ আমাদের জানিয়ে দিল পর্দার বিধান তার খুনিদের হিংস্রতা প্রশমন করতে পারেনি । এই রাষ্ট্রও তাকে বাঁচার অধিকার নিশ্চিত করতে পারে নাই। রমজানের পবিত্রতা খুনীদের একটুও স্পর্শ করতে পারে নাই। । তার বাবা একজন টেক্সটাইল শ্রমিক। ভাড়া বাসায় থাকা এক সাধারণ পরিবার। স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী কয়েকজন যুবকের হাতে প্রথমে অপহরণ ও ধর্ষণ। তারপর কথিত সালিশ। অভিযোগ আছে, প্রভাবশালীদের মধ্যস্থতায় ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়া হয়। কিন্তু অভিযোগ করায় ক্ষুব্ধ হয়ে আবারও বাবার কাছ থেকে অস্ত্রের মুখে ছিনিয়ে নেওয়া হয় মেয়েটিকে। পরে শ্বাসরোধে হত্যা। লাশ ফেলে রাখা হয় সরিষার ক্ষেতে।

ভাবুন, যে বাবা মেয়ের হাত শক্ত করে ধরে নিরাপদে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন, তার হাত থেকেই যদি মেয়েকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়, সেই মুহূর্তের অসহায়তা কতটা গভীর ছিল। সেই আর্তচিৎকার কি আমরা শুনতে পাই? নাকি আমরা ইচ্ছাকৃতভাবে বধির হয়ে গেছি?
রাষ্ট্র যদি জনগণের নিরাপত্তার জন্য হয়, তবে এই ঘটনাটি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়েছে। প্রধান আসামি এখনও পলাতক। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে অপরাধীদের যোগসাজশ ছিল। এমনকি একটি রাজনৈতিক দলের উপজেলা পর্যায়ের নেতার নামও এসেছে গ্রেপ্তার তালিকায়।


এটি কেবল একটি অপরাধ নয়। এটি ব্যর্থতার ধারাবাহিকতা। প্রথম ব্যর্থতা—প্রথম ধর্ষণের পর ন্যায়বিচার নিশ্চিত না করা। দ্বিতীয় ব্যর্থতা—ভুক্তভোগী পরিবারকে নিরাপত্তা না দেওয়া। তৃতীয় ব্যর্থতা—রফাদফার সংস্কৃতি। চতুর্থ ব্যর্থতা—আমাদের নীরবতা।
অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বহুবার বলেছেন, “প্রথম অপরাধের বিচার না হলে দ্বিতীয় অপরাধের সাহস তৈরি হয়।” তার গবেষণায় উঠে এসেছে, গ্রামাঞ্চলে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ছত্রচ্ছায়ায় অপরাধীরা দ্রুত পুনরায় সংঘবদ্ধ হয় যদি আইনি প্রক্রিয়া শুরুতেই দুর্বল হয়ে পড়ে।


মানবাধিকারকর্মী ও আইন ও সালিশ কেন্দ্র-এর সাবেক নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল বারবার সতর্ক করেছেন, “ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনায় সামাজিক মীমাংসা আসলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি করে। এতে ভুক্তভোগী আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।” তার মতে, দরিদ্র পরিবারের মেয়েরা দ্বিগুণ অসহায়—একদিকে অপরাধীর হুমকি, অন্যদিকে সামাজিক চাপে চুপ থাকার বাধ্যবাধকতা।


ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এ ঘটনা স্পষ্ট অপরাধ। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামিক চিন্তাবিদ ড. মুহাম্মদ তাহের-উল-কাদরি তার বিভিন্ন বক্তৃতায় বলেছেন, “একজন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা সমগ্র মানবজাতিকে হত্যার সমান গুরুতর অপরাধ। ধর্ষণ ও জোরপূর্বক সহিংসতা ইসলামে স্পষ্ট হারাম এবং এর শাস্তি কঠোর।” একইভাবে বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলেম মুফতি ফয়জুল করিমও প্রকাশ্যে বলেছেন, ধর্ষণকারীর জন্য সামাজিক রফাদফা নয়, আইনের কঠোর প্রয়োগই একমাত্র পথ।


একটি প্রশ্ন আমাদের তাড়া করে—মেয়েটি যদি রাজধানীর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হতো, মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হতো, তবে কি প্রতিক্রিয়া এমন নীরব থাকত? সহানুভূতিও কি আমাদের দেশে শ্রেণিভেদে বণ্টিত হয়?
আমেনার মা হয়তো এখনো দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন। বাবা হয়তো নিজেকে ক্ষমা করতে পারেন না, যদিও তার কোনো দোষ ছিল না। সরিষার হলুদ ফুলের মাঝে পড়ে থাকা সেই দেহটি শুধু একটি লাশ ছিল না। ছিল একটি স্বপ্ন, একটি স্কুলব্যাগ, একটি ভবিষ্যৎ।
আমেনার মৃত্যু আমাদের সামনে স্পষ্ট দাবি রাখে—দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত, প্রধান আসামিসহ সকল অভিযুক্তের গ্রেপ্তার, বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, ধর্ষণ মামলায় বেআইনি সালিশের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
শুধু শোক জানালে চলবে না। ক্ষণিকের ক্ষোভে কিছু বদলায় না। বিচার না হলে বার্তা যাবে—দরিদ্রের মেয়ের জীবন সস্তা। অভিযোগ করলে মরতে হবে।


একটি রাষ্ট্রের শক্তি বোঝা যায় সে কতটা দুর্বলকে রক্ষা করতে পারে তা দিয়ে। ১৫ বছরের এক কিশোরীকে যদি বাবার হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে হত্যা করা যায়, তবে আমরা কেউই নিরাপদ নই।
নীরবতা কখনও নিরপেক্ষ নয়। নীরবতা অনেক সময় অপরাধীর পক্ষে দাঁড়ায়।


এই হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। কোনো আপস নয়। কোনো রাজনৈতিক ছায়া নয়। কোনো রফাদফা নয়।
আমরা কোথায় যাচ্ছি—এই প্রশ্নের উত্তর এখনই দিতে হবে। না হলে আগামী সরিষাক্ষেতে আবারও পড়ে থাকবে আরেকটি কিশোরীর লাশ।




বিশ্লেষক:

মানবাধিকার কর্মী
লেখক, গবেষক ও পর্যবেক্ষক
(সীমান্তহীন গণতন্ত্র) 


কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ