ইরানের হামলায় লাভবান হবে ইসরায়েল
মে মাসে মধ্যপ্রাচ্য সফরের সময় আঞ্চলিক নেতাদের সামনে দাঁড়িয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির একটি নতুন যুগের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, এই নীতি অঞ্চলকে পুনর্গঠন বা এর শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা দ্বারা পরিচালিত হবে না।
তিনি আরো বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত তথাকথিত জাতি-নির্মাতারা যতটা দেশ গড়েছেন তার চেয়ে বেশি দেশ ধ্বংস করেছেন, আর হস্তক্ষেপকারীরা এমন জটিল সমাজে হস্তক্ষেপ করেছেন যেগুলো তারা নিজেরাই বুঝতে পারেননি।’
এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে ‘স্বাধীনতা’ আনার কথা বলে বড় ধরনের হামলার নির্দেশ দেন।
এ সময় তিনি সেই একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করেন, যেটা আগে জর্জ ডব্লিউ বুশের মতো নেতারা ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু তাদের নিয়ে তিনি আগে সমালোচনা করতেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ট্রাম্পের ঘোষিত রাজনৈতিক আদর্শ, নীতিগত লক্ষ্য বা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কয়েকজন ইরান-বিশেষজ্ঞ আলজাজিরাকে জানিয়েছেন, ট্রাম্প ইসরায়েলের সঙ্গে মিলিতভাবে এমন একটি যুদ্ধ পরিচালনা করছেন, যা মূলত ইসরায়েল ও তার প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুরই উপকারে আসবে।
ওয়াশিংটন, ডিসির সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির একজন সিনিয়র ফেলো নেগার মোর্তাজাভি বলেন, ‘এটি আবারও ইসরায়েলের চাপে আমেরিকার শুরু করা একটি পছন্দের যুদ্ধ। এটি আরেকটি ইসরায়েলি যুদ্ধ, যা আমেরিকা শুরু করছে। ইসরায়েল দুই দশক ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানে আক্রমণ করতে চাপ দিয়েছে এবং অবশেষে তারা তা পেয়েছে।’
মোর্তাজাভি তার পূর্বসূরীদের সমালোচনা তুলে ধরেন, যারা এই অঞ্চলে শাসন-পরিবর্তনের যুদ্ধ চালিয়েছিলেন।
তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘এটা বিদ্রূপাত্মক, কারণ তিনি (ট্রাম্প) নিজেকে ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ বলে দাবি করেন।’
ইরানের ‘হুমকি’ সম্পর্কে সতর্কীকরণের ইতিহাস
২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আক্রমণকে উৎসাহিতকারী নেতানিয়াহু দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সতর্ক করে আসছেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের দ্বারপ্রান্তে। তবে ইরান বার বার পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা অস্বীকার করেছে। এমনকি ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, ওয়াশিংটনের কাছে এমন কোনো প্রমাণ নেই যে, তেহরান তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
গত বছরের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রধান সমৃদ্ধকরণ স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলা চালানোর পর ট্রাম্প বলেছেন, তারা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে।
নেতানিয়াহু একটি নতুন কথিত ইরানি হুমকির দিকে দৃষ্টি দেন, তেহরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র।
তিনি অক্টোবরে ইসরায়েলপন্থী পডকাস্টার বেন শাপিরোকে বলেন, ‘ইরান যেকোনো আমেরিকান শহরকে ব্ল্যাকমেইল করতে পারে।’ যা মানুষ এটা বিশ্বাস করে না। ইরান ৮ হাজার কিলোমিটার (৫০০০ মাইল) পাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে। তারা আরো ৩ হাজার (১৮০০ মাইল)যোগ করবে, তাহলে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে পৌঁছাতে পারবে।’ ট্রাম্প এই সপ্তাহের শুরুতে তার স্টেট অফ দ্য ইউনিয়ন ভাষণে সেই দাবির পুনরাবৃত্তি করেছেন, যা তেহরান দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে এবং কোনোজনসাধারণের প্রমাণ বা পরীক্ষা দ্বারা সমর্থিত হয়নি।
তিনি ইরানীদের সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘তারা ইতিমধ্যেই এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে, যা ইউরোপ এবং বিদেশে আমাদের ঘাঁটিগুলোকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে এবং তারা শীঘ্রই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাবে এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্য কাজ করছে।’
জুনের সংঘাতের পর থেকে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে আরো বিস্তৃত যুদ্ধের জন্য পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। বারবার দেশটিকে আবার বোমা হামলার হুমকি দিচ্ছেন। কিন্তু গত বছর মার্কিন রাষ্ট্রপতির নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যকে অগ্রাধিকার না দিয়ে পশ্চিম গোলার্ধের ওপর বেশি মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল।
এদিকে, ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের অভিজ্ঞতার পর বিশ্বব্যাপী সংঘাত নিয়ে সতর্ক মার্কিন জনগণও ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলার বিরোধী, জনমত জরিপে এমনটাই দেখা গেছে।
মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক জরিপে মাত্র ২১ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, তারা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়ার পক্ষে। যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা ও সামরিক স্থাপনা অবস্থিত বিভিন্ন ঘাঁটি এবং শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, ফলে পুরো অঞ্চল বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে। ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, এই সংঘাতে মার্কিন সেনাদের হতাহতের ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি শনিবার বলেন, ‘যুদ্ধে এমনটি প্রায়ই ঘটে। তবে আমরা এটি এখনকার জন্য বলছি না। আমরা এটি ভবিষ্যতের জন্য বলছি। আর এটি একটি মহৎ লক্ষ্য।’
বেশিরভাগ আমেরিকানদের উপেক্ষা
এই মাসের শুরুর দিকে তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনায় বসে ট্রাম্প প্রশাসন সংঘাতের দিক থেকে কিছুটা পিছিয়ে এসেছে বলে মনে হয়েছিল। গত সপ্তাহে মার্কিন ও ইরানি আলোচকরা তিন দফা বৈঠক করেন। সেখানে তেহরান জোর দিয়ে জানায়, তারা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর কঠোর আন্তর্জাতিক পরিদর্শনে সম্মত হতে প্রস্তুত।
ওমানি মধ্যস্থতাকারী এবং ইরানি কর্মকর্তারা বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত সর্বশেষ দফার আলোচনাকে ইতিবাচক বলে বর্ণনা করেন এবং জানান, এতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের উসকানিবিহীনভাবে শুরু করা যুদ্ধটিও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার মধ্যেই শুরু হয়েছিল।
জামাল আবদি, ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিল (এনআইএসি)-এর সভাপতি, আল জাজিরাকে বলেন, ‘কূটনৈতিক সমাধান ঠেকানোই সবসময় নেতানিয়াহুর লক্ষ্য ছিল। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, ট্রাম্প সত্যিই একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী। তাই আলোচনার মাঝখানে এই যুদ্ধ শুরু হওয়া তার জন্য একটি সাফল্য। যেমনটি গত জুনেও হয়েছিল।’
তিনি আরো বলেন, ‘শাসন পরিবর্তনের ভাষাকে ট্রাম্পের সমর্থন করা নেতানিয়াহুর জন্য আরো একটি বিজয় এবং আমেরিকান জনগণের জন্য ক্ষতি। কারণ এটি ইঙ্গিত দেয়, যুক্তরাষ্ট্র একটি দীর্ঘ ও অনিশ্চিত সামরিক অভিযানে জড়িয়ে পড়তে পারে।’
শনিবার হামলার ঘোষণা দিতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, তার লক্ষ্য হলো ইরানকে আমেরিকা এবং আমাদের মূল জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থকে হুমকি দেওয়া থেকে বিরত রাখা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচকরাযুক্তি দিয়েছেন, ১০ হাজার কিলোমিটার (৬ হাজার মাইল) দূরে অবস্থিত ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো সরাসরি হুমকি নয়। সমালোচকদের মধ্যে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ আন্দোলনের কিছু সমর্থকও রয়েছেন।
এই মাসের শুরুর দিকে ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি রক্ষণশীল ভাষ্যকার টাকার কার্লসনকে বলেন, ‘ইরান না থাকলে হিজবুল্লাহ থাকত না, লেবানন সীমান্তে আমাদের কোনো সমস্যাও থাকত না।’ এর জবাবে কার্লসন বলেন, ‘লেবানন সীমান্তে কী সমস্যা? আমি একজন আমেরিকান। বর্তমানে লেবানন সীমান্তে আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি মেইনে বসবাস করি।’
শনিবার কংগ্রেসওম্যান রাশিদা তালিব জোর দিয়ে বলেন, মার্কিন জনগণ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চায় না। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প আমেরিকান রাজনৈতিক অভিজাত ও ইসরায়েলি বর্ণবাদী সরকারের সহিংস কল্পনার প্রতিফলন ঘটাচ্ছেন, অথচ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ আমেরিকান স্পষ্টভাবে বলছে, ‘আর কোনো যুদ্ধ নয়।’
কমেন্ট বক্স