ইরান যুদ্ধের অদৃশ্য সংকট: তেলের নয়, পানির যুদ্ধ
// আহমেদ সোহেল //
বিশ্বজুড়ে যখন ইরানকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে, তখন অধিকাংশ আলোচনাই আবর্তিত হচ্ছে তেল, জ্বালানি ও ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে। কিন্তু বাস্তবে এই সংঘাতের একটি গভীর মানবিক মাত্রা রয়েছে, যা এখনও বৈশ্বিক আলোচনায় যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। সেটি হলো পানি নিরাপত্তা। মধ্যপ্রাচ্যের আধুনিক নগরসভ্যতা আজ অনেকাংশে নির্ভর করছে সমুদ্রের নোনা পানি লবণমুক্ত করার প্রযুক্তি—ডিস্যালিনেশন—এর ওপর। চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যদি এসব অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে তা কেবল শিল্প স্থাপনা ধ্বংসের ঘটনা হবে না; বরং কয়েক কোটি মানুষের জীবনযাত্রা মুহূর্তেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভৌগোলিক বাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন। এখানে বড় নদী নেই বললেই চলে, বৃষ্টিপাত কম, অথচ জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে এবং নগরায়ন বিস্তৃত হচ্ছে। ফলে গত কয়েক দশকে উপসাগরীয় দেশগুলো ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ করেছে সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করার প্রযুক্তিতে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান Arab Center Washington DC–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে উৎপাদিত লবণমুক্ত পানির প্রায় ৬০ শতাংশ উৎপাদন করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমান। এই দেশগুলোর মধ্যে কুয়েতের পানীয় জলের প্রায় ৯০ শতাংশ, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রায় ৯৬ শতাংশ, ওমানের প্রায় ৮৬ শতাংশ এবং সৌদি আরবের প্রায় ৭০ শতাংশ আসে ডিস্যালিনেশন প্রযুক্তি থেকে। অর্থাৎ এসব দেশের দৈনন্দিন জীবন—খাওয়া, কৃষি, শিল্প, স্বাস্থ্যব্যবস্থা—সবকিছুই নির্ভর করছে এই প্রযুক্তির ওপর।
বিশ্বের বৃহত্তম দশটি ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টের আটটিই অবস্থিত আরব উপদ্বীপে। এই বাস্তবতা বোঝায় যে মধ্যপ্রাচ্যের আধুনিক মরুভূমি সভ্যতার জন্য ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টগুলো শুধু শিল্প স্থাপনা নয়; বরং এগুলো কার্যত জীবনরেখা।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের আওতায় পানি সরবরাহ অবকাঠামোকে সাধারণত সুরক্ষিত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। Geneva Convention অনুযায়ী পানি সরবরাহ অবকাঠামোতে হামলা মানবিক অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি সেই ধারণাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের কিছু পানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো ইতোমধ্যেই হামলার ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
বর্তমান সংঘাত আর সীমিত পর্যায়ে নেই; বরং এটি ইতোমধ্যে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে বিস্তৃত একটি বহুমাত্রিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। গত প্রায় নয় দিন ধরে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ড্রোন আক্রমণ এবং পাল্টা সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন সামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোর পাশাপাশি বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং গুরুত্বপূর্ণ শিল্প স্থাপনাগুলোও হামলার ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এই পরিস্থিতি স্পষ্ট করে যে সংঘাতটি এখন আর কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা ধীরে ধীরে পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে জড়িয়ে ফেলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই সংঘাত একই মাত্রায় চলতে থাকে, তবে তা দ্রুত একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত হতে পারে। কারণ উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো কৌশলগতভাবে একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত—কেউ সামরিক জোটের মাধ্যমে, কেউ অর্থনৈতিক ও জ্বালানি অবকাঠামোর মাধ্যমে। ফলে একটি দেশের অবকাঠামোতে হামলার প্রতিক্রিয়া খুব দ্রুত অন্য দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ Strait of Hormuz যদি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে, তবে তার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতির ওপরও তীব্রভাবে পড়তে পারে।
মার্কিন নিরাপত্তা বিশ্লেষক Michael E. O'Hanlon মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো বড় আকারের অবকাঠামোগত সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতি ও মানবিক পরিস্থিতির ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ Peter Gleick দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন যে ভবিষ্যতের অনেক সংঘাতের কেন্দ্রে থাকবে পানি। তার মতে, পানি অবকাঠামো ধ্বংস হলে তা শুধু পরিবেশগত নয়, সরাসরি মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
এই যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা। বর্তমানে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কাজ করছেন। তাদের বড় অংশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও কুয়েতে কর্মরত। যুদ্ধ পরিস্থিতি তীব্র হলে প্রথমেই ঝুঁকিতে পড়বে তাদের কর্মসংস্থান। অনেক শিল্প ও নির্মাণ প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেলে লাখো শ্রমিক কাজ হারাতে পারেন। একই সঙ্গে খাদ্য ও পানি সরবরাহ ব্যাহত হলে শ্রমিকদের আবাসিক এলাকাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি অবনতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের চলাচল সীমিত হয়ে যেতে পারে। বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে জরুরি পরিস্থিতিতে দেশে ফেরা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তাই বাংলাদেশ সরকারের উচিত এখন থেকেই দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে প্রবাসীদের তথ্য হালনাগাদ করা এবং জরুরি প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখা।
যুদ্ধ বা দুর্যোগের সময় পানি সরবরাহ ব্যাহত হলে কিছু বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। ছোট আকারের মোবাইল ডিস্যালিনেশন ইউনিট ব্যবহার করে দ্রুত সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করা সম্ভব। বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা নগর এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হতে পারে। ব্যবহৃত পানি পুনর্ব্যবহার করে কৃষি ও শিল্পে ব্যবহার করা যেতে পারে। মরুভূমি অঞ্চলে সৌরশক্তি ব্যবহার করে ছোট পরিসরে পানি বিশুদ্ধ করার প্রযুক্তিও কার্যকর হতে পারে। পাশাপাশি বড় শহরগুলোতে অন্তত কয়েক সপ্তাহের জন্য জরুরি পানির রিজার্ভ গড়ে তোলাও জরুরি।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও পানির বিষয়টি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের বিচক্ষণ প্রধানমন্ত্রী Tarique Rahman ভূগর্ভস্থ পানির সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি বিভিন্ন বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন যে দেশের ভবিষ্যৎ পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। নগরায়ন, কৃষি ও শিল্পে পানির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে; ফলে এখনই কার্যকর নীতি গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের পানি সংকট তৈরি হতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গি বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আমাদের দেখিয়ে দিচ্ছে যে পানি কেবল একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও মানবিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
এই সংঘাত বাংলাদেশের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হলেও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত কমছে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে ভবিষ্যতে পানির সংকট আরও তীব্র হতে পারে। তাই এখন থেকেই পানি ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং বিকল্প প্রযুক্তি ব্যবহারের দিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
শেষ পর্যন্ত বিষয়টি পরিষ্কার—মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধ কেবল একটি ভূরাজনৈতিক সংঘাত নয়; এটি ভবিষ্যতের এক নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আধুনিক সভ্যতার নীরব ভিত্তি—পানি—যদি যুদ্ধের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়, তবে তার পরিণতি হবে বহুগুণ ভয়াবহ। তেলের সংকট অর্থনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু পানির সংকট মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত এখনই যুদ্ধের নিয়ম মেনে পানি অবকাঠামোকে সুরক্ষিত রাখার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়া। কারণ শেষ পর্যন্ত সভ্যতার টিকে থাকার প্রশ্নটি তেলের নয়—পানির।
লেখক:
মানবাধিকার কর্মী
গবেষক ও বিশ্লেষক, সীমান্তহীন গণতন্ত্র
প্যারিস, ফ্রান্স
কমেন্ট বক্স