তদবির সংস্কৃতির বেড়াজালে রাষ্ট্র: বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ
//মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন//
বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ, যা স্বাধীনতার পর থেকে নানা চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে আজ চব্বিশের বিপ্লব পরবর্তী গণতান্ত্রিক ধারার মধ্যদিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই অগ্রযাত্রার পথে একটি বড় অন্তরায় হলো তদবিরবাজ দালালদের প্রভাব। রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে তাদের সক্রিয় উপস্থিতি প্রশাসন, অর্থনীতি এবং বিশেষ করে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা খাতকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
বাংলাদেশে তদবির সংস্কৃতির উৎপত্তি ও বিস্তার:
বাংলাদেশে তদবির বা সুপারিশের সংস্কৃতি নতুন নয়। ঔপনিবেশিক আমল থেকেই ব্যক্তিগত প্রভাব ও সম্পর্কের মাধ্যমে কাজ আদায়ের প্রবণতা গড়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে স্বাধীনতার পরও পুরোপুরি দূর হয়নি। ধীরে ধীরে এটি একটি সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সরকারি চাকরি, পদোন্নতি, ঠিকাদারি কাজ বা এমনকি আইনি সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রেও তদবির একটি প্রচলিত মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে করে একটি “অফিসিয়াল” ব্যবস্থার পাশাপাশি একটি “অনানুষ্ঠানিক প্রভাববলয়” গড়ে উঠেছে।
প্রশাসনে তদবিরবাজ দালালদের প্রভাব:
বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোতে তদবিরের প্রভাব একটি বড় সমস্যা। অনেক সময় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতি বা রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করে। এতে করে যোগ্য প্রার্থীরা পিছিয়ে পড়ে এবং অযোগ্য ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়।
এর ফলে প্রশাসনের দক্ষতা কমে যায় এবং সেবা প্রদানের মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাধারণ মানুষকে ন্যায্য সেবা পেতে অতিরিক্ত সময় ও ভোগান্তির শিকার হতে হয়।
প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে ঝুঁকি:
বাংলাদেশের মতো একটি ভূ-রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশের জন্য প্রতিরক্ষা খাত অত্যন্ত সংবেদনশীল। কিন্তু যদি এই খাতেও তদবিরবাজ দালালদের প্রভাব পড়ে, তাহলে তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়, অবকাঠামো উন্নয়ন বা অন্যান্য কৌশলগত সিদ্ধান্তে যদি অস্বচ্ছতা থাকে, তাহলে নিম্নমানের সরঞ্জাম বা অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাস্তবায়নের ঝুঁকি তৈরি হয়। এতে রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় হয় এবং সামরিক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে।
এছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষেত্রেও যদি তদবিরের প্রভাব থাকে, তাহলে অপরাধ দমন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। প্রভাবশালী অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারে, যা সমাজে আইনের শাসনকে দুর্বল করে।
অর্থনীতি ও উন্নয়ন প্রকল্পে প্রভাব:
বাংলাদেশে বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে দালালদের প্রভাব একটি আলোচিত বিষয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের ব্যয় অযৌক্তিকভাবে বেড়ে যায়, কাজের মান কম হয় এবং সময়মতো প্রকল্প শেষ হয় না।
তদবিরের মাধ্যমে ঠিকাদার নির্বাচন হলে যোগ্যতার পরিবর্তে প্রভাবই প্রধান হয়ে ওঠে। এতে করে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হয় এবং জনগণ প্রত্যাশিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়।
বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এই ধরনের পরিবেশে বিনিয়োগ করতে দ্বিধা বোধ করে, কারণ তারা একটি স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল ব্যবসায়িক পরিবেশ চায়।
সামাজিক প্রভাব ও নৈতিক অবক্ষয়:
বাংলাদেশের সমাজে তদবির সংস্কৃতি একটি নেতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দেয়—“যোগ্যতার চেয়ে পরিচয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।” এর ফলে তরুণ সমাজ হতাশ হয়ে পড়ে এবং অনেকেই সৎ পথে এগোনোর অনুপ্রেরণা হারায়।
এছাড়া এটি সামাজিক বৈষম্যও বাড়ায়। যারা প্রভাবশালী, তারা সহজে সুযোগ পায়; আর সাধারণ মানুষ বঞ্চিত থাকে।
সমাধানের উপায়; বাংলাদেশের জন্য করণীয়:
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সমস্যা সমাধানের জন্য কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে:
• স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা: পাবলিক সার্ভিস কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও স্বাধীন ও কার্যকর করতে হবে।
• ই-গভর্ন্যান্স বৃদ্ধি: ডিজিটাল পদ্ধতিতে সেবা প্রদান বাড়ালে তদবিরের সুযোগ কমবে।
• দুর্নীতি দমন জোরদার: দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) আরও শক্তিশালী ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।
• রাজনৈতিক সদিচ্ছা: তদবির সংস্কৃতি বন্ধ করতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃঢ় অবস্থান জরুরি।
• সামাজিক আন্দোলন: নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে হবে।
চব্বিশের ছাত্র-জনতার ত্যাগের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই সময় অর্জিত বিপ্লবের আলোকে আমাদের গণতান্ত্রিক যাত্রা টেকসই করতে হলে তদবিরবাজ দালালদের প্রভাবমুক্ত একটি সুশাসিত রাষ্ট্র গড়ে তোলা অপরিহার্য। অন্যথায় এই নব যাত্রার সকল অর্জনগুলো ঝুঁকির মুখে পড়বে।
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং নৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমেই বাংলাদেশ এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে।
✍🏿লেখক
সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী mahbubhossain786@yahoo.com
কমেন্ট বক্স