১১ এপ্রিল ২০২৬ , ২৭ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬

সরকারি দল বিএনপি সবকিছু শেষ করে দেওয়ার অপকৌশল নিয়েছে- বিরোধী দলীয় নেতা

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপলোড সময় : ১০-০৪-২০২৬
সরকারি দল বিএনপি সবকিছু শেষ করে দেওয়ার অপকৌশল নিয়েছে- বিরোধী দলীয় নেতা
জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সরকারি দল বিএনপি সবকিছু শেষ করে দেওয়ার অপকৌশল নিয়েছে। শুক্রবার (১০ এপ্রিল) রাতে জাতীয় সংসদের অধিবেশন শেষে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। 

তিনি বলেন, আমরা আজ মুখের ওপরই বলেছি, আপনারা (সরকারি দল) ওয়াদা ভঙ্গ করেছেন। আপনাদের ওপর আমাদের কোনো আস্থা নেই। উনারা সবকিছু শেষ করে দেওয়ার অপকৌশল নিয়েছেন। সেই অপকৌশলের ফাঁদে আমরা পা দিতে চাইনি বলেই তো ওয়াকআউট করেছি।

জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এই সংসদ গত ১২ মার্চ থেকে কাজ শুরু করেছে। বিধি মোতাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ উত্থাপিত হয়েছে; এটাই নিয়ম। উত্থাপনের ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে এগুলো নিষ্পত্তি করতে হবে। ওই দিনই সংসদ থেকে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। সরকারি দলের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটিতে সরকারি ও বিরোধী উভয় দলের সদস্যরা ছিলেন। আলাপ-আলোচনা ও বিভিন্ন সেশন হয়েছে। কিন্তু পরে হঠাৎ দেখা গেল একটি রিপোর্ট তৈরি হয়ে গেছে। আমরা বিরোধী দলের সদস্যদের জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা কি সবাই মিলে এই রিপোর্টটি চূড়ান্ত করেছেন? তারা জানালেন, এ ধরনের কোনো চূড়ান্তকরণ বৈঠকই হয়নি। পরে যোগাযোগ করে দেখা গেল, শুধু সরকারি দলের সদস্যরা মিলেই রিপোর্টটি চূড়ান্ত করে ফেলেছেন। অথচ উচিত ছিল সবাই মিলে এটি সম্পন্ন করা অথবা এমন একটি ছোট দলকে দায়িত্ব দেওয়া যেখানে সরকারি ও বিরোধী উভয় পক্ষের প্রতিনিধি থাকবে। তার কিছুই করা হয়নি। পরবর্তীতে আমাদের আপত্তির মুখে কিছু বিষয় সংযোজন করা হলেও এটি কোনো সঠিক বা সুস্থ ধারা ছিল না। মূলত সেখান থেকেই সমস্যার শুরু।

তিনি বলেন, আমরা দেখলাম যে বিলের রিপোর্টের একটি জায়গায় ক, খ, গ ইত্যাদি ভাগ করা হয়েছে। এটি দেখে পরবর্তী কার্যউপদেষ্টা কমিটির মিটিংয়ে আমরা বললাম যে, সংসদে ১৩৩টি অধ্যাদেশই উত্থাপন করা হয়েছে। বিশেষ কমিটির কাজ হলো এগুলোর ওপর কাজ করে তা পুনরায় সংসদে উত্থাপন করা। তাদের এখান থেকে কোনো কিছু বাদ দেওয়া বা রাখার অধিকার নেই; এটি সংসদের সম্পত্তি। আমাদের দাবি ছিল ১৩৩টি অধ্যাদেশের সব কটি নিয়েই আলোচনা হতে হবে। কার্যউপদেষ্টা কমিটির দীর্ঘ বৈঠকে এ নিয়ে আইনি দিক ও নানা সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে মন্ত্রীরা কথা বলেছেন। শেষ পর্যন্ত আমাদের যুক্তির সাথে একমত হয়ে স্পিকার বলেছিলেন, প্রতিটি অধ্যাদেশই আলোচনার জন্য আসবে। এর জন্য শুক্রবার ছুটির দিনে সংসদ বসা এবং রাত ১২টা পর্যন্ত আলোচনা করে নিষ্পত্তি করার বিষয়েও আমরা রাজি হয়েছিলাম।

কিন্তু আজকে কী হলো? আমরা দেখলাম জাতির নিরাপত্তা ও প্রত্যেকটি নাগরিকের জীবনের সঙ্গে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করে সেগুলোকে ল্যাপস (তামাদি) হওয়ার তালিকায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। তারা আজকে এগুলো উত্থাপনই করবে না। সর্বশেষ বিলের আগে ছিল ‘জুলাই জাদুঘর বিল’। এই বিলে সবার ঐকমত্য ছিল যে, অন্তর্বর্তী সরকার যেভাবে অধ্যাদেশ জারি করেছে, সেটিকে অপরিবর্তিত রেখেই পাস করা হবে এবং সংসদে সেভাবেই উত্থাপনও করা হলো। কিন্তু হঠাৎ দেখা গেল সরকারি দলের একজন সদস্য হাত তুললেন। সাধারণত বিল উত্থাপনের সময় সরকারি দল একমত থাকে এবং আপত্তি থাকলে বিরোধী দল হাত তোলে। কিন্তু এখানে সরকারি দলের একজন সদস্য হাত তোলার পর স্পিকার তাকে কথা বলার সুযোগ দিলেন এবং তিনি তিনটি সংশোধনী নিয়ে আসলেন। এই তিনটি সংশোধনীর ব্যাপারে আমাদের নীতিগত আপত্তি আছে। তবে তার চেয়ে বড় আপত্তির জায়গা হলো, আমরা জানলামই না যে তিনি কী সংশোধনী এনেছেন; তা জানার কোনো সুযোগই দেওয়া হয়নি। তারা হয়তো বলবেন মেমোতে দেওয়া হয়েছে। 

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, হঠাৎ করে এটিকে একটি দলীয় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। বলা হলো, মন্ত্রণালয় যেহেতু এটি তদারকি করবে, তাই মন্ত্রী না থাকলে এটি চলবে কীভাবে? পরে তারা খোলামেলাভাবেই বলে ফেললেন যে, এখানে সরকারি দলের নিয়ন্ত্রণ না থাকলে এটি পরিচালনা করা সম্ভব নয়। এমনকি আমাদের বোঝানোর জন্য এটাও বলা হলো যে, আজকে আপনারা বিরোধী দলে আছেন, আগামীতে সরকারি দলে আসলে আপনারাও এই সুবিধা পাবেন। আমরা বললাম, লজ্জা (শেইম)। আমরা এখানে কোনো সুবিধা নেওয়ার জন্য আসিনি; এসেছি জনগণের অধিকার রক্ষা করতে। সেরকম সুবিধা আমরা চাইও না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্পিকার আমাদের কোনো আপত্তিই শুনলেন না।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নিয়ম অনুযায়ী আমাদের কমপক্ষে একদিন আগে সমস্ত নথিপত্র (ডকুমেন্ট) সরবরাহ করার কথা, কিন্তু তা দেওয়া হয়নি। আমরা অধিবেশনে বসার মাত্র এক ঘণ্টা আগে এক বস্তা কাগজ আমাদের সামনে আনা হলো। এখন আমরা যা দেখলাম না, শুনলাম না কিংবা যা নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ পেলাম না, সে বিষয়ে রায় দেব কীভাবে? তারপরও যেহেতু সরকারি ও বিরোধী দল মিলে বিশেষ কমিটি হয়েছিল এবং তারা যেসব বিষয়ে একমত হয়েছিলেন, আমরা তাদের ওপর আস্থা রেখেছিলাম। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে সরকারি দল সেই আস্থাও ভঙ্গ করেছে। তারা যুক্তি দেখালেন যে, মন্ত্রী ছাড়া বাকি সকল সদস্যই বেসরকারি। কিন্তু যদি তারা বেসরকারিই হয়ে থাকেন, তবে সংস্কৃতিমন্ত্রী হিসেবে আপনি এটি গ্রহণ করলেন কেন? আপনি গ্রহণ করার মাধ্যমে তো এটি আর বেসরকারি থাকল না। আপনার ‘মেমো’ হিসেবে আসার পর এটিকে আর বেসরকারি বলার সুযোগ নেই। আমরা যখন তাকে এ বিষয়ে ধরলাম, তিনি বক্তব্যে দাঁড়িয়ে বললেন যে, তিনি নিজেও এটি জানতেন না।

জামায়াত আমির বলেন, এই পার্লামেন্টে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীও যদি না জানেন যে কী হচ্ছে, তবে কলকাঠি কোথা থেকে নাড়ানো হচ্ছে? এভাবে একটি গণতান্ত্রিক সংসদ চলতে পারে না। আমরা স্পিকারের কাছে এ বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে জানতে চেয়ে আপত্তি জানালে তিনি আমাদের কেবল সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, স্পিকার সংসদের সর্বোচ্চ ব্যক্তি। তার কাছে আমরা স্পষ্ট জানতে চাই, দুদক বিল, পুলিশ সংস্কার কমিশন বিল, গুম কমিশন বিল ও পিএসসি বিল আসবে কি না? এগুলোর সাথে প্রতিটি নাগরিকের ভাগ্য জড়িত। এসব প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করেই অতীতে ফ্যাসিজম কায়েম করা হয়েছে এবং অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। গণভোট অধ্যাদেশও আছে। সরকার এগুলো আনবে না; তারা আনবে শুধু সেগুলোই, যেগুলোতে ফ্যাসিজম বহাল থাকবে এবং যা ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য প্রয়োজন।

স্থানীয় সরকার বিল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারাই তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এবং ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবে বলেছিলেন যে, কোনো স্তরেই তাঁরা অনির্বাচিত কোনো প্রতিনিধি দেখতে চান না। কিন্তু তাঁরা নিজেদের কথা নিজেরা রাখেননি, জাতির সাথে দেওয়া প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করেননি। এই আচরণ সম্পূর্ণ স্ববিরোধী।

সরকার সংসদে আস্থাহীনতার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে উল্লেখ করে এর নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, এই পার্লামেন্ট আমরা মেনে নিয়েছি, তবে এই সংসদ ও নির্বাচন নিয়ে অনেক কথা আছে। সেই নির্বাচনের পক্ষে অন্তত দুজন ‘রাজসাক্ষী’ পাওয়া গেছে। নির্বাচন প্রকৌশল (ইঞ্জিনিয়ারিং) নিয়ে সাবেক উপদেষ্টা পরিষদের একজন সদস্য এবং বর্তমান সরকারি দলের একজন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী কথা বলেছেন। প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, আন্দোলন ছাত্ররা করেছে, আমরাও ছিলাম; তবে ‘ক্যাপ্টেন’-এর হাতে ট্রফি প্রফেসর ড. ইউনুস লন্ডনে গিয়ে তুলে দিয়ে এসেছেন। লজ্জা (শেইম)!

জামায়াত আমির প্রশ্ন তোলেন, ট্রফি যদি ওখানেই দেওয়া হয়ে থাকে, তবে কিসের নির্বাচন? তার মানে নির্বাচনের ভাগ্য আগে থেকেই পর্দার আড়ালে ঠিক করে জাতিকে ব্ল্যাকমেইল করা হয়েছে, যার প্রমাণ আপনারা গতকাল দেখেছেন।

দেশবাসীকে প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, কথা দিচ্ছি, জনগণের অধিকারের পক্ষে লড়াই করতে গিয়ে আমরা কোনোভাবেই চুল পরিমাণ ছাড় দেব না। আমাদের অবস্থান অক্ষুণ্ণ থাকবে ইনশাআল্লাহ। আমাদের এই লড়াই জনগণের অধিকার আদায়ের লড়াই। জনগণের গণরায় ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন হলেই সব সমস্যার সমাধানের পথ খুলে যাবে বলে আমরা মনে করি। সংসদে আমরা সুবিচার পাইনি; ইনশাআল্লাহ, জনগণকে সাথে নিয়েই আমরা সেই দাবি আদায় করে ছাড়ব।

তিনি বলেন, অতীতেও এই ধরনের সংসদে কিছু কিছু বিলকে গুরুত্বই দেওয়া হয়নি। পরে তারা নিজেরাই সেগুলো গ্রহণে বাধ্য হয়েছেন। গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষের রায়কে অগ্রাহ্য করার মানে হচ্ছে গণতন্ত্র ও জনগণকে অপমান করা। সব দাবি আদায় হবে এবং সেই দাবি আদায় করতে গিয়ে যত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, আমরা প্রস্তুত। দেশের জন্য, জনগণের অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত এ লড়াই অব্যাহত থাকবে।

সরকারি দলের হুইপ বলেছেন যে ১৬টি অধ্যাদেশ উত্থাপন করা হয়নি, সেগুলো পরবর্তী অধিবেশনে বিল আকারে আনা হবে, আপনারা এটি বিশ্বাস করেন কি না? জানতে চাইলে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আমরা সেখানে মুখের ওপরই বলেছি যে আপনারা ওয়াদা ভঙ্গ করেছেন, তাই আপনাদের ওপর আমাদের কোনো আস্থা নেই। আপনারা এখন আনেননি, পরবর্তী পর্যায়ে আনবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি না।

আরেক প্রশ্নের জবাবে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণভোটকে তাঁরা অস্বীকার করছেন। গণভোটকে অস্বীকার না করলে অধ্যাদেশ ল্যাপস (তামাদি) হয় কীভাবে? গণভোটের প্রতি সম্মান দেখানোর জন্যই তো সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কথা ছিল। তাঁরা প্রথম দিনই তো সেটি লঙ্ঘন করেছেন। প্রথম দিনই জাতিকে অপমান করেছেন, অগ্রাহ্য করেছেন। এখন তারা কীভাবে এসব কথা বলেন? 

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামসহ জামায়াত ও বিরোধী জোটের শীর্ষস্থানীয় সংসদ সদস্যরা। 
 


কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ