১১ এপ্রিল ২০২৬ , ২৮ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬

"বাবা - কষ্টতে সুখ পাওয়া এক সম্পর্ক"

আপলোড সময় : ১১-০৪-২০২৬
"বাবা - কষ্টতে সুখ পাওয়া এক সম্পর্ক"




//আহমেদ সোহেল বাপ্পী// 


মধ্য সমুদ্রের বুকে একটা ক্ষুদ্র নৌকা।
চারদিকে শুধু জল— অসীম, নির্মম, নিঃশব্দ। আকাশ আর সমুদ্রের মাঝে কোথাও একটা রেখা আছে, কিন্তু সেই রেখাটুকু ছাড়া আর কিছুই নেই। কোনো তীর নেই, কোনো আলো নেই, কোনো ভরসা নেই।
শুধু আছেন এক বাবা।
আর তাঁর কোলে ঘুমিয়ে আছে একটা ছোট্ট ছেলে।
ছেলেটার নাম ইয়াহিয়া।
কিডনি রোগ তার শরীরের ভেতরে প্রতিদিন একটু একটু করে আলো নিভিয়ে দিচ্ছে। প্রতি মাসে ডায়ালাইসিস চাই, ১২০০ ইউরো চাই— একজন নির্মাণ শ্রমিকের কাছে এই সংখ্যাটা শুধু টাকা নয়, এটা স্বপ্নের চেয়েও দূরের কিছু।

বাবার নাম আব্দুল আজিজ।
তিনি অনেকদিন চেষ্টা করেছেন। হাতজোড় করেছেন, দরজায় দরজায় গেছেন, মাথা নত করেছেন— যা একজন মানুষ কখনো করতে চায় না। কিন্তু লেবাননের ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামনে একজন গরিব বাবার প্রার্থনা পৌঁছায় না।
তখন তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন।
নিজের কিডনি দেবেন ছেলেকে।
কারণ? কারণ নেই আসলে। একজন বাবা কখনো হিসাব করেন না কেন তিনি সন্তানের জন্য সব দিয়ে দেন। এটা তাঁর সিদ্ধান্ত নয়— এটা তাঁর স্বভাব।
পাঁচ হাজার ইউরো জোগাড় হলো।
কীভাবে? সেই প্রশ্নের উত্তর একটু কষ্টের। নিজের শেষ সঞ্চয়, পরিবারের জমানো টাকা, হয়তো কারো কাছে হাত পেতে নেওয়া কিছু— সব মিলিয়ে। স্ত্রী আর আট সন্তানকে রেখে তিনি বেরিয়ে পড়লেন। বেরিয়ে পড়ার সময় স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়েছিলেন কি না, জানা যায় না। হয়তো তাকাননি। কারণ তাকালে হয়তো পা আর সরত না।
একদিন ভোরবেলা, ছোট্ট ইয়াহিয়াকে বুকের কাছে নিয়ে তিনি উঠলেন একটা কাঠের নৌকায়।
গন্তব্য— সাইপ্রাস।
সঙ্গে কিছু খেজুর, সামান্য পানি। দালালরা বলেছিল, বেশিক্ষণ লাগবে না।
কিন্তু সমুদ্রের কাছে কোনো প্রতিশ্রুতি নেই।
প্রথম দিন গেল।
দ্বিতীয় দিন গেল।
তৃতীয় দিন সকালে খাবার শেষ হয়ে গেল।
ইয়াহিয়া বলল, "বাবা, পানি।"
আব্দুল আজিজ আকাশের দিকে তাকালেন। তৃষ্ণায় তাঁর নিজের গলাও ফেটে যাচ্ছে। কিন্তু ছেলের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, "একটু পরেই আসবে, জান। একটু পরেই।"
মিথ্যে কথা।
কিন্তু এই মিথ্যেটুকু ছাড়া সেই মুহূর্তে আর কী দেওয়ার ছিল তাঁর?
চতুর্থ দিন বৃষ্টি নামল।
আব্দুল আজিজ নিজের হাত দুটো পেতে দিলেন আকাশের দিকে। বৃষ্টির পানি জমতে লাগল হাতের তালুতে। তারপর সেই হাত এগিয়ে দিলেন ছেলের ঠোঁটের কাছে।
"খা, বাবা।"
ইয়াহিয়া পানি খেল। আর আব্দুল আজিজ শূন্য হাত নামিয়ে রাখলেন।
পাঁচ মিটার উঁচু ঢেউ এলো। নৌকাটা যেন আকাশে উঠে গেল, তারপর পাতালে। ইয়াহিয়া চিৎকার করে বাবার হাত চেপে ধরল। আব্দুল আজিজ সেই ছোট্ট হাতটা নিজের বুকের ভেতর চেপে নিলেন— যেভাবে মানুষ বাঁচাতে চায় সবচেয়ে দামি জিনিসটাকে।

সপ্তম দিন।

শরীরে আর শক্তি নেই। চোখ বুজে আসছে। ইয়াহিয়া অচেতনের মতো বাবার কোলে পড়ে আছে। আব্দুল আজিজ ছেলের মুখের দিকে তাকালেন— শুকনো ঠোঁট, বসে যাওয়া গাল, বন্ধ চোখ।

তিনি মনে মনে বললেন— হয়তো ঠোঁট নেড়েও বললেন— "না। তোকে ছাড়ব না। এখনো না।"

তারপর দিগন্তে একটা কালো বিন্দু দেখা গেল।

একটা জাহাজ।

তারা উদ্ধার পেলেন।
সাইপ্রাসে পৌঁছালেন।

দুই বছর পর, ২০০৫ সালে, গ্রীসের একটি ট্রান্সপ্লান্ট সেন্টারে অপারেশন টেবিলে শুয়ে আব্দুল আজিজ সেই কাজটি করলেন— যার জন্য সমুদ্র পেরিয়েছিলেন।

নিজের শরীর থেকে একটা কিডনি বের করে দিলেন ছেলের শরীরে।

অপারেশনের পর যখন ইয়াহিয়া চোখ খুলল, বাবা পাশে বসে ছিলেন। শরীরে ব্যথা, চোখে ক্লান্তি— কিন্তু মুখে একটা হাসি, যে হাসির কোনো নাম হয় না।

আজ ইয়াহিয়া বেঁচে আছে।

স্কুলে যায়। বন্ধুদের সাথে দৌড়ায়। হয়তো কখনো কখনো সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকে, আর বোঝার চেষ্টা করে— সেই সাত দিন তার বাবার বুকের ভেতর কী চলছিল।

সে কোনোদিন বুঝবে না পুরোটা।

কারণ বাবার ভালোবাসা ভাষায় ধরা যায় না— সমুদ্রের গভীরতার মতো, দেখা যায় না, কিন্তু সব কিছু ধরে রাখে।

আব্দুল আজিজ কোনো বীর নন।

তিনি একজন সাধারণ মানুষ, যাঁর পকেটে টাকা ছিল না, ক্ষমতা ছিল না, পরিচয় ছিল না।

শুধু ছিল একটা জিনিস— ছেলেকে বাঁচাতে হবে।

এই এক বাক্যের ভেতরে তিনি পুরো সমুদ্র পার হয়েছেন।
এই এক বাক্যের ভেতরে তিনি নিজের শরীরের একটা অংশ তুলে দিয়েছেন আরেকটা শরীরে।

পৃথিবীতে ভালোবাসা অনেক রকমের আছে।

কিন্তু বাবার ভালোবাসা একটু আলাদা।
এই ভালোবাসা কথা বলে না, গান গায় না, ফুল দেয় না।
এই ভালোবাসা শুধু— দাঁড়িয়ে থাকে।
ঝড়ে, অন্ধকারে, সমুদ্রের মাঝে—
দাঁড়িয়েই থাকে। 
বাবা তো ? সুখ শান্তি বাবার এখানেই 

লেখক: 
মানবাধিকার কর্মী
গবেষক পর্যবেক্ষক গণতন্ত্র (সীমান্ত হীন)
প্যারিস,ফ্রান্স 


কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ