১১ এপ্রিল ২০২৬ , ২৮ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬

ইসলামাবাদে অনুষ্টিত হচ্ছে আলোচিত এ বৈঠক

বিশ্ব তাকিয়ে আজ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বৈঠকের দিকে

ইউরো বার্তা ডেস্ক
আপলোড সময় : ১১-০৪-২০২৬
বিশ্ব তাকিয়ে আজ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বৈঠকের দিকে
ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্যেই পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় বৈঠকে বসছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। ইসলামাবাদে আজকের এ শান্তি আলোচনায় মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নিরসনের পথ খোঁজা হবে।

মধ্যপ্রাচ্যের কোটি কোটি মানুষের জীবন এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে এ বৈঠকের ওপর। আলোচনা ইতিবাচক হলে যুদ্ধ বন্ধ, আর ব্যর্থ হলে নতুন করে সংঘাত শুরু হতে পারে। যা বিশ্বকে এক ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের মুখে ঠেলে দেবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে চরম অস্থিরতা ও মন্দার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। শান্তি ও বিশ্ব অর্থনীতির এ ভাগ্যনির্ধারণী সমীকরণের কারণেই এখন ইসলামাবাদের দিকে তাকিয়ে পুরো বিশ্ব।

পাকিস্তানের রাজধানীতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এ ‘নির্ণায়ক’ আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে এমন এক প্রেক্ষাপটে, যেখানে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা থাকলেও বাস্তবতা ঝুঁকিপূর্ণ। গত ৪০ দিনের যুদ্ধের পর ঘোষিত দুই সপ্তাহের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি আপাতত টিকে আছে, কিন্তু সেই বিরতির ভিত কতটা শক্ত, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়ে গেছে।

আলোচনার সবচেয়ে বড় জটিলতা হলো, দুই পক্ষই এখনো স্পষ্টভাবে একমত হতে পারছে না যে তারা আসলে কী নিয়ে আলোচনা করবে। যুদ্ধবিরতির শর্ত নিয়েই যখন বিভ্রান্তি, তখন আলোচনার এজেন্ডা নির্ধারণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার সময় যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছিল, ইরানের দেয়া একটি ১০ দফা প্রস্তাব আলোচনার জন্য গ্রহণযোগ্য ভিত্তি হতে পারে। কিন্তু এরপর ইরান যে ১০ দফা তালিকা প্রকাশ করেছে, তাতে এমন কিছু দাবি রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে মেনে নেয়া প্রায় অসম্ভব। এর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ স্বীকৃতি দেয়া, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ প্রদান, সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া এবং পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণের অধিকার স্বীকার করা। হোয়াইট হাউজ বলছে, ট্রাম্প যে প্রস্তাবের কথা বলেছেন সেটি ভিন্ন এবং আরো যুক্তিসংগত। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নিজেরও একটি ১৫ দফা প্রস্তাব রয়েছে, যেখানে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি থেকে সরে আসা, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর, প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় সীমাবদ্ধতা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়ার মতো শর্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।

গতকাল ইসলামাবাদে রওনা দেয়ার আগমুহূর্তে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানকে সতর্ক করে বলেছেন, আলোচনায় কোনো ছলচাতুরীর চেষ্টা করলে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচক দল তা গ্রহণ করবে না। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ইরান যদি আন্তরিকভাবে আলোচনায় বসতে চায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রও ‘খোলা মন’ নিয়ে এগোতে প্রস্তুত। তবে ইরান যদি কৌশলী আচরণ বা প্রতারণার আশ্রয় নেয়, তাহলে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাবে না।

অন্যদিকে যুদ্ধ-পরবর্তী হরমুজ আর আগের অবস্থানে ফিরবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজ। তিনি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে টোল নেয়ার কৌশলগত প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে, যা প্রয়োজনে ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।’ তার ভাষায়, ‘যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে প্রণালির ব্যবস্থাপনা আর আগের অবস্থায় ফিরবে না। বর্তমানে প্রণালিতে জাহাজ চলাচল এরই মধ্যে ইরানি বাহিনীর ঘনিষ্ঠ নজরদারিতে রয়েছে। টোল আদায়ের প্রস্তাবে অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ইরানের নিজস্ব মুদ্রা রিয়াল ব্যবহারের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।’

এ অবস্থায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, দুই পক্ষ কি কোনো মধ্য পন্থায় পৌঁছতে পারবে, নাকি আলোচনাই ভেঙে যাবে এবং আবারো যুদ্ধ শুরু হবে। কারণ এ যুদ্ধ এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নজিরবিহীন সংকট তৈরি করেছে। যুদ্ধবিরতি থাকলেও পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত ভঙ্গুর—যেকোনো মুহূর্তে তা ভেঙে পড়তে পারে।

এ ভঙ্গুরতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ লেবাননকে ঘিরে মতবিরোধ। ইরান বারবার বলছে, যুদ্ধবিরতির আওতায় তাদের মিত্র হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে হামলাও অন্তর্ভুক্ত। পাকিস্তানও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে একই অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল স্পষ্টভাবে বলছে, লেবানন এ চুক্তির অংশ নয়।

গতকাল ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দাবি করেন, ইরানের জব্দকৃত সম্পদ অবমুক্ত ও লেবাননে যুদ্ধবিরতি এ দুটি শর্ত আগেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতায় ছিল এবং সেগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আলোচনা শুরু হবে না। ফলে নির্ধারিত বৈঠক ঘিরে শেষ মুহূর্তে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এ পরিস্থিতি আলোচনার আগেই সেটিকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ইউরোপ ও উপসাগরীয় দেশগুলোও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই যুদ্ধবিরতি ভেঙে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, লেবানন নিয়ে ‘বৈধ ভুল বোঝাবুঝি’ হয়েছে। তবে এ ব্যাখ্যা সংকটকে খুব একটা কমাতে পারেনি। বরং স্পষ্ট হয়েছে, চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো নিয়েই দুই পক্ষের অবস্থান কতটা বিপরীতমুখী।

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরেও একই ধরনের অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। এ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ, যা কয়েক সপ্তাহ ধরে কার্যত অচল হয়ে আছে। ফলে বৈশ্বিক তেলের বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। হোয়াইট হাউজ বলছে, যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এখনো খুব কমসংখ্যক জাহাজ সেখানে চলাচল করতে পারছে। শত শত জাহাজ পারস্য উপসাগরে আটকে আছে, যার মধ্যে হাজার হাজার নাবিক অবস্থান করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইরান যদি প্রণালি খুলে দেয়ার প্রতিশ্রুতি পূরণ না করে তাহলে যুদ্ধবিরতি শেষ হয়ে যাবে। ট্রাম্প নিজেও সতর্ক করেছেন, তেলবাহী জাহাজের ওপর কোনো ধরনের টোল আরোপের চেষ্টা করা হলে তা মেনে নেয়া হবে না।

পরস্পরবিরোধী এমন অবস্থানের কারণে মাত্র একটি বৈঠক সংকট সমাধানে কতটা ভূমিকা রাখবে তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এ বৈঠক মূলত দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার একটি শুরু মাত্র। সামনে আরো কয়েক দফা কঠিন ও জটিল আলোচনা হবে, যার মাধ্যমে একটি স্থায়ী সমঝোতার পথ তৈরি করার চেষ্টা করা হবে।

এ বৈঠককে ঘিরে ইসলামাবাদে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় গত দুদিন ছুটি ঘোষণা করা হয় শহরটিতে। আলোচনার আগেই রাজধানী কার্যত লকডাউন করে দেয়া হয়। দুটি সূত্র জানিয়েছে, আলোচনাটি বিলাসবহুল সেরেনা হোটেলে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা, যেখান থেকে অতিথিদের সরিয়ে দেয়া হয়েছে এবং হোটেলটি সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেয়া হয়েছে। আশপাশের রাস্তা সিল করা হয়েছে, চেকপয়েন্ট ও টহল বাড়ানো হয়েছে, আকাশপথে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং জরুরি সেবাগুলো সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে।

আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে থাকবেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে থাকছেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। তেহরানের নেতৃত্ব দেবেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় ইরানের অনেক শীর্ষ নেতা নিহত হওয়ায় গালিবাফ এখন ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে উঠেছেন। একদিকে তিনি রক্ষণশীল হিসেবে পরিচিত, অন্যদিকে কূটনৈতিক আলোচনায় সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে তাকে কেউ কেউ আপসকামী হিসেবেও দেখছেন।

পাকিস্তান এমন একটি কাজ করার চেষ্টা করছে যাকে অনেক বিশ্লেষক ‘মিশন ইম্পসিবল’ বলে মনে করেন। মিডল ইস্ট পলিসি কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ ফেলো কামরান বোখারি বলেছেন, পাকিস্তান এখন আর শুধু বার্তাবাহকের ভূমিকায় নেই, বরং সক্রিয়ভাবে আলোচনা প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প প্রশাসন পাকিস্তানকে বেছে নিয়েছে কারণ ইসলামাবাদ শুধু ওয়াশিংটনের সঙ্গেই কথা বলতে পারে না, ইরানের চিন্তাভাবনাকেও প্রভাবিত করতে সক্ষম। একইভাবে পাকিস্তান এখন মার্কিন চিন্তাকেও আকার দেয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

শনিবারের আলোচনায় পাকিস্তান সম্ভবত দুটি বিষয় সামনে আনবে। ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগ এবং লেবানন পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি বিস্তারের দাবি।

তবে পাকিস্তানের এ মধ্যস্থতার সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। স্টিমসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া কার্যক্রমের পরিচালক এলিজাবেথ থ্রেলকেল্ড বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান সমঝোতায় আসতে না চাইলে পাকিস্তানের কাছে কোনো পক্ষকে ছাড় দিতে বাধ্য করার মতো কার্যকর লিভারেজ নেই। এটিই তার ভূমিকার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, যেকোনো নতুন উত্তেজনা দ্রুত আলোচনার পরিসর সংকুচিত করে দিতে পারে। পাকিস্তানের চ্যালেঞ্জ শুধু আলোচনার স্থান রক্ষা করা নয়, কক্ষের বাইরের শক্তিগুলো যেন কূটনীতিকে ছাপিয়ে না যায়, সেটাও নিশ্চিত করা।


কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ