//এরশাদ উল্লাহ নকিব//
লন্ডন, যুক্তরাজ্য (PhD Researcher )
পৃথিবীতে কিছু শূন্যতা আছে, যা কোনোদিন পূরণ হয় না। সময় তার উপর ধুলো জমাতে পারে, ব্যস্ততা তাকে কিছুটা আড়াল করতে পারে, কিন্তু হৃদয়ের গভীর থেকে মুছে দিতে পারে না। বাবার শূন্যতা ঠিক তেমনই এক বাস্তবতা—যে শূন্যতা প্রতিদিন নতুন করে অনুভূত হয়, প্রতিদিন নতুন করে কাঁদায়।
বাবা ছিলেন আমাদের পরিবারের ছায়াদানকারী বিশাল বৃক্ষ। আমরা যখন নিশ্চিন্তে জীবন কাটিয়েছি, তখন তিনি নীরবে রোদে পুড়েছেন। আমরা যখন স্বপ্ন দেখেছি, তখন তিনি সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য নিজের ঘুম, আরাম এবং সুখ বিসর্জন দিয়েছেন। তাঁর কপালের ঘাম শুকানোর আগেই আমাদের মুখে হাসি ফুটেছে। অথচ আমরা কত কমই তাঁকে বলেছি—“আব্বা, আপনাকে ভালোবাসি।”
আজ বুঝি, বাবা ছিলেন একটি ঘরের ছাদ। সেই ছাদটি মাথার উপর থাকলে ঝড়-ঝঞ্ঝা যতই আসুক, ভয়ের কিছু থাকে না। কিন্তু যখন সেই ছাদটি সরে যায়, তখনই বোঝা যায় তার প্রয়োজনীয়তা কত গভীর ছিল।
ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে হাঁটতে শিখেছি। তাঁর আঙুল ধরে রাস্তা পার হয়েছি। জীবনের কঠিন মোড়ে তাঁর পরামর্শ ছিল আমাদের কম্পাস, তাঁর উপস্থিতি ছিল সাহসের উৎস। তিনি হয়তো খুব বেশি কথা বলতেন না, কিন্তু তাঁর নীরব উপস্থিতিই ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা।
আজও কখনো কোনো সুখবর পাই, অজান্তেই মনে হয়—“আহা! আব্বাকে যদি একবার বলতে পারতাম!” আবার কোনো দুঃসময়ে বুকের ভেতর থেকে একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে—“আব্বা থাকলে হয়তো এমন হতো না।”
বাবা চলে যাওয়ার পর বুঝেছি, মানুষ শুধু একজন মানুষকে হারায় না; হারায় একটি আশ্রয়, একটি ছায়া, একটি ভরসার ঠিকানা। ঘরে তাঁর ব্যবহৃত চেয়ারটি হয়তো এখনো আছে, তাঁর বইগুলো হয়তো তাকেই সাজানো আছে, কিন্তু তিনি নেই। সেই না-থাকাটাই সবচেয়ে বড় উপস্থিতি হয়ে হৃদয়ের ভেতর বেঁচে থাকে।
ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, পিতা-মাতার মর্যাদা কত মহান। আল্লাহ তাআলা কুরআনে নিজের ইবাদতের পরই পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। রাসূল ﷺ আমাদের শিখিয়েছেন, সন্তানের দোয়া মৃত্যুর পরও পিতা-মাতার জন্য রহমতের দরজা খুলে দেয়। তাই আজ বাবার জন্য আমাদের সবচেয়ে বড় উপহার হতে পারে একটি আন্তরিক দোয়া, একটি নেক আমল, একটি সদকায়ে জারিয়া।
বাবা আজ পৃথিবীর মাটির নিচে শায়িত। কিন্তু তাঁর শিক্ষা, তাঁর আদর্শ, তাঁর দোয়া এবং তাঁর ভালোবাসা এখনো আমাদের জীবনের অংশ। তিনি চোখের আড়ালে চলে গেছেন, কিন্তু হৃদয়ের আড়ালে নন। প্রতিটি নামাজের শেষে, প্রতিটি মুনাজাতে, প্রতিটি স্মৃতির ভাঁজে আমরা তাঁকে খুঁজে পাই।
পৃথিবীতে বাবার শূন্যতা কেউ পূরণ করতে পারে না। কারণ বাবা কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি সন্তানের জীবনের প্রথম নায়ক, প্রথম শিক্ষক, প্রথম অভিভাবক এবং প্রথম নিরাপদ আশ্রয়।
আজও যখন বাবার কথা মনে পড়ে, মনে হয়—কোথাও যেন তিনি আছেন। হয়তো আল্লাহর রহমতের ছায়ায়, হয়তো জান্নাতের কোনো প্রশান্ত বাগানে। আর আমরা এখানে দাঁড়িয়ে তাঁর জন্য হাত তুলে দোয়া করি।
হে আল্লাহ! আমাদের বাবাদের ক্ষমা করুন। তাঁদের কবরকে জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগানে পরিণত করুন। তাঁদের ভুলত্রুটি মার্জনা করুন, তাঁদের মর্যাদা বৃদ্ধি করুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন।
আমীন, ইয়া রব্বাল আলামীন।