//আবু তাহির মুস্তাকিম//
যখন শাসক বাস্তব সমস্যার উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়, তখন সে প্রায়ই একটি কাল্পনিক শত্রু তৈরি করে। এই যেমন, সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাাশিয়ার পতন ঘটলো ১৯৯০-এর দশকে। এর পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইসলামী মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের জিগির তুলেছিল পশ্চিমাবিশ্ব। যুক্তরাষ্ট্র নাইন-ইলেভেনের ধুয়া তুলে কথিত ইসলামী জঙ্গিবাদ দমনে আফগানিস্তান ও ইরাকে হামলা চালায়। কয়েক বছর পর কোন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন ছাড়াই বিনা শর্তে তড়িঘড়ি করে বাড়ি ফিরে যায় মার্কিন সেনারা। সম্ভবত এ অধ্যায়ের সবশেষে ছিল ইরানের সাথে যুদ্ধ। সে যুদ্ধে পরাজয়ের পর নতুন করে মার্কসবাদী জুজুর আতংক ছড়াবার চেষ্টা শুরু করেছে মার্কিন প্রশাসন।
ইতিহাসের এই পুরোনো রাজনৈতিক কৌশলই আবার ফিরে এসেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষণে। আমেরিকার স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানানোর পরিবর্তে তিনি স্বাধীনতা দিবসের মঞ্চকে ব্যবহার করলেন আদর্শগত বিভাজন সৃষ্টির অস্ত্র হিসেবে। তাঁর ভাষণে বারবার ফিরে এসেছে "কমিউনিস্ট", "মার্ক্সিস্ট", "নবাগত অভিবাসী" এবং "আমেরিকার শত্রু"—যেন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সংকট আজ কোনো অর্থনৈতিক বৈষম্য, স্বাস্থ্যসেবা বা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা নয়; বরং কার্ল মার্ক্সের দেড়শ বছরের পুরোনো ভূত।
ইতিহাসের পরিহাস এখানেই। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পশ্চিমা বিশ্ব ঘোষণা করেছিল—মার্ক্সবাদ ইতিহাসের আবর্জনার স্তূপে নিক্ষিপ্ত হয়েছে, উদার পুঁজিবাদই মানবসভ্যতার চূড়ান্ত গন্তব্য। তখন বলা হয়েছিল, আদর্শগত লড়াই শেষ। কিন্তু তিন দশক পর বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যদি আবার কমিউনিজমকে জাতীয় অস্তিত্বের সর্ববৃহৎ হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করেন, তাহলে প্রশ্ন জাগে—আসলে কে মার্ক্সকে ফিরিয়ে আনছে? মার্ক্সবাদীরা, নাকি ট্রাম্প নিজেই?
১৮৪৮ সালে কার্ল মার্ক্স লিখেছিলেন, "একটি ভূত ইউরোপকে তাড়া করছে—কমিউনিজমের ভূত।" সেই ভূতকে নির্মূল করার জন্য তখন ইউরোপের রাজা, যাজক, পুলিশ ও শাসকেরা একজোট হয়েছিল। একুশ শতকে এসে সেই একই ভূতের ভয় যদি আবার হোয়াইট হাউস পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তাহলে তা মার্ক্সের শক্তির প্রমাণ নয়; বরং পুঁজিবাদী রাজনীতির আত্মবিশ্বাসের সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
ট্রাম্পের বক্তব্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক কেবল কমিউনিজমবিরোধিতা নয়; বরং রাজনৈতিক বিরোধিতাকে দেশদ্রোহিতার সঙ্গে একাকার করে ফেলা। তিনি এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি নির্মাণ করতে চান, যেখানে ভিন্নমত মানেই জাতির শত্রু। অথচ গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো মতের বহুত্ব। একজন নাগরিক মার্ক্স, অ্যাডাম স্মিথ, জন লক কিংবা ইসলামী— যে চিন্তাই গ্রহণ করুন না কেন, সেটি তাঁর রাজনৈতিক স্বাধীনতার অংশ।
ট্রাম্প যখন বলেন, "তুমি হয় মার্ক্সবাদী, নয়তো দেশপ্রেমিক", তখন তিনি আসলে দেশপ্রেমকে একটি সংকীর্ণ রাজনৈতিক আনুগত্যে নামিয়ে আনেন। যেন রাষ্ট্র কোনো বহুমতের নাগরিক সমাজ নয়, বরং একদলীয় বিশ্বাসের দুর্গ। এই ভাষা গণতন্ত্রের নয়; কর্তৃত্ববাদের ভাষা।
আরও বিপজ্জনক হলো অভিবাসীদের সঙ্গে কমিউনিজমের সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা। এটি নতুন কিছু নয়। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, অর্থনৈতিক সংকটের সময় শাসকেরা প্রকৃত সমস্যার পরিবর্তে দুর্বল জনগোষ্ঠীকে দোষারোপ করেছেন। কখনও অভিবাসী, কখনও মুসলিম, কখনও সমাজতন্ত্রী। এতে বাস্তব সমস্যার সমাধান হয় না; বরং সমাজে ঘৃণা ও বিভাজন বাড়ে।
আমেরিকার ইতিহাসও এই ধরনের রাজনৈতিক আতঙ্কের সাক্ষী। ম্যাকার্থিবাদের সময় "কমিউনিস্ট" তকমা দিয়ে হাজার হাজার মানুষের কর্মজীবন ধ্বংস করা হয়েছিল। শিল্পী, শিক্ষক, সাংবাদিক, সরকারি কর্মকর্তা—কেউ রেহাই পাননি। পরে ইতিহাস সেই অধ্যায়কে গণতন্ত্রের জন্য কলঙ্ক হিসেবেই চিহ্নিত করেছে। আজ "মার্ক্সিস্ট" শব্দকে রাজনৈতিক গালিতে পরিণত করার প্রবণতা সেই অন্ধকার সময়েরই প্রতিধ্বনি।
ট্রাম্পের ভাষণে ইতিহাসের আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতাও স্পষ্ট—অতীতকে নির্বীজ করে জাতীয়তাবাদ নির্মাণ। যখন তিনি বলেন, "আমরা চুরি করা জমিতে বাস করি—এ কথা মার্ক্সবাদী মিথ্যা", তখন তিনি আমেরিকার উপনিবেশ স্থাপন, আদিবাসীদের উচ্ছেদ, দাসপ্রথা ও বর্ণবাদের দীর্ঘ ইতিহাসকে অস্বীকার করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ইতিহাস অস্বীকার করলেই ইতিহাস মুছে যায় না। বরং অতীতের অন্যায়কে স্বীকার করাই একটি পরিণত জাতির পরিচয়।
রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কেন এখন আবার মার্ক্স? কেন মূল্যস্ফীতি, আবাসন সংকট, স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়, শিক্ষাঋণের বোঝা কিংবা আয়বৈষম্যের পরিবর্তে আদর্শগত আতঙ্ককে সামনে আনা হচ্ছে? কারণ বাস্তব সমস্যার সমাধান কঠিন; কিন্তু কল্পিত শত্রু তৈরি করা সহজ। শত্রু যত বড় দেখানো যায়, শাসকের ব্যর্থতা তত আড়াল করা যায়।
এ কথা সত্য যে মার্ক্সবাদ নিয়ে তীব্র বিতর্ক রয়েছে। বিংশ শতকে মার্ক্সবাদের নামে প্রতিষ্ঠিত বহু রাষ্ট্রে মানবাধিকার লঙ্ঘন, একদলীয় শাসন ও রাজনৈতিক নিপীড়নের ইতিহাসও রয়েছে। এসব সমালোচনা করা অবশ্যই বৈধ। কিন্তু কোনো মতাদর্শের সমালোচনা আর সেই মতাদর্শের নামে ভিন্নমতাবলম্বী নাগরিককে জাতির শত্রু ঘোষণা করা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
একটি আত্মবিশ্বাসী গণতন্ত্র বইকে ভয় পায় না, চিন্তাকে ভয় পায় না, বিতর্ককে ভয় পায় না। যে রাষ্ট্র একটি দার্শনিকের দেড়শ বছরের পুরোনো লেখাকেও অস্তিত্বের সংকট হিসেবে তুলে ধরে, সে আসলে নিজের রাজনৈতিক দুর্বলতার কথাই প্রকাশ করে।