১৬ অগাস্ট ২০২৬ ,  ১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬

পক্ষপাতদুষ্টতার অভিযোগ: ব্যাপক সমালোচনার মুখে ফিফা

Admin News
আপলোড সময় : ১৩-০৭-২০২৬
পক্ষপাতদুষ্টতার অভিযোগ: ব্যাপক সমালোচনার মুখে ফিফা


//আবু তাহির মুস্তাকিম//



ফুটবলকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে নিরপেক্ষ ভাষা। এখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ কিংবা রাজনীতির চেয়ে বড় হয়ে ওঠে একটি বল, একটি গোল আর কোটি মানুষের আবেগ। কিন্তু যখন সেই খেলার সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিরপেক্ষতাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তখন বিতর্ক আর শুধু ফুটবলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা বিশ্ব বিবেকেরও প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

সাম্প্রতিক সময়ে ফিফাকে ঘিরে একের পর এক বিতর্ক সেই প্রশ্নকেই আরও তীব্র করেছে। রেফারিং নিয়ে অভিযোগ, বিভিন্ন সিদ্ধান্তে দ্বৈত মানদণ্ডের অভিযোগ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের আলোচনা—সব মিলিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের একটি বড় অংশের মনে প্রশ্ন জেগেছে, ফিফা কি সত্যিই সবার জন্য সমান?

চলতি বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের পর এক মার্কিন ফুটবল খেলোয়াড়ের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে মিসর ও কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচে রেফারিদের সিদ্ধান্ত পক্ষপাতদুষ্ট ছিল; যেটি আর্জেন্টিনার পক্ষে ছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে।


এই বিতর্ক নতুন নয়। বিশেষ করে ফিলিস্তিন ইস্যুতে বহু বছর ধরেই ফিফার ভূমিকা সমালোচিত হয়ে আসছে। ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবস্থিত ইসরায়েলি বসতির ক্লাবগুলোর কার্যক্রম আন্তর্জাতিক আইন ও ক্রীড়া নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কিন্তু সেই অভিযোগের কার্যকর নিষ্পত্তি আজও হয়নি। সমালোচকদের মতে, ফিফা এমন একটি অবস্থান নিয়েছে, যা সংস্থাটির ঘোষিত মানবাধিকার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সমস্যা কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেই সীমাবদ্ধ নয়। যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে ফিলিস্তিনি ফুটবলারদের মৃত্যু, আহত হওয়া, আটক হওয়া কিংবা স্টেডিয়াম ও ক্রীড়া অবকাঠামো ধ্বংসের ঘটনাগুলোও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। এসব ঘটনার পরও ফিফার নীরবতা অনেকের কাছে বিস্ময়কর। প্রশ্ন উঠেছে—মানবাধিকার কি সবার জন্য সমান, নাকি তারও ভৌগোলিক সীমারেখা রয়েছে?

ফিফার সমালোচকেরা মনে করেন, সংস্থাটি প্রায়ই রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার অজুহাতে এমন বিষয়গুলো এড়িয়ে যায়, যেখানে নৈতিক অবস্থান নেওয়া জরুরি। অথচ একই ফিফা অতীতে বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, বৈষম্য বা আন্তর্জাতিক নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। এই বৈপরীত্য থেকেই জন্ম নিয়েছে "দ্বৈত মানদণ্ড"-এর অভিযোগ।

সম্প্রতি ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলকে নিয়ে একটি প্রতীকী "শান্তি ম্যাচ" আয়োজনের প্রস্তাবও নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। সমর্থকেরা এটিকে সংলাপের উদ্যোগ হিসেবে দেখলেও সমালোচকদের প্রশ্ন, সংঘাতের মূল কারণ ও মানবাধিকার সংকট অমীমাংসিত রেখে শুধুমাত্র প্রতীকী ম্যাচ কি সত্যিই শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে? নাকি এটি বাস্তব সংকট থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার একটি প্রচেষ্টা?

ফিফা সবসময় দাবি করে এসেছে, তারা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থা। কিন্তু বাস্তবে যখন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো বারবার বিতর্কের জন্ম দেয়, তখন সেই দাবির বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্রীড়া কখনোই পুরোপুরি রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়—এ কথা সত্য। কিন্তু ক্রীড়া পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব হলো অন্তত ন্যায়বিচার ও সমতার প্রশ্নে একই মানদণ্ড অনুসরণ করা।

বিশ্ব ফুটবলের শক্তি তার বৈচিত্র্যে, তার অন্তর্ভুক্তিতে এবং তার ন্যায়সঙ্গত প্রতিযোগিতায়। যদি কোনো সংস্থা সেই নীতিগুলো রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাস।

ফুটবল মাঠে বিজয়-পরাজয় ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু ন্যায়বিচারের প্রশ্নে নেওয়া সিদ্ধান্ত ইতিহাসে থেকে যায়। তাই আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি গোলপোস্টের সামনে নয়, ফিফার দরজায়—বিশ্ব ফুটবলের অভিভাবক কি সত্যিই সবার জন্য সমান, নাকি সবুজ মাঠেও ক্ষমতার রাজনীতি শেষ পর্যন্ত জয়ী হচ্ছে?




কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ