০৮ অক্টোবর ২০২৬ ,  ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

লিওনে প্রথম দিন: বাপ-বেটির চোখে নতুন এক শহর

মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম
আপলোড সময় : ১৮-০৮-২০২৬
লিওনে প্রথম দিন: বাপ-বেটির চোখে নতুন এক শহর


ফ্রান্সের ঐতিহাসিক ও নান্দনিক শহর লিওনে আমাদের কয়েক দিনের সফর শুরু হলো ভোরের আলো ফোটার আগেই। দীর্ঘ যাত্রার পর ট্রেন এসে থামল Lyon–Saint-Exupéry TGV স্টেশনে। নতুন একটি শহরে প্রথম পা রাখার অনুভূতিটাই আলাদা। তার ওপর লিওনের মতো ঐতিহ্যবাহী ও সুপরিকল্পিত একটি শহরের স্টেশনে নেমে প্রথম দেখাতেই চোখে পড়ল পরিচ্ছন্নতা, আধুনিক স্থাপত্য ও গোছানো পরিবেশ।


স্টেশনেই আমাদের অপেক্ষায় ছিলেন আহসান হাবীব ইমরোজ ভাইয়ের শ্যালক সারওয়ার ভাই। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তির মধ্যে পরিচিত একজন মানুষের আন্তরিক অভ্যর্থনা যেন অনেকটা স্বস্তি এনে দিল। সারওয়ার ভাই গাড়িতে করে আমাদের তাঁর বাসায় নিয়ে গেলেন। সেখানে কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর দুপুরে তাঁর বাসায় হলো চমৎকার আয়োজনের খাবার। বিদেশের মাটিতে আপনজনের এমন আন্তরিক আতিথেয়তা ভ্রমণের আনন্দকে নিঃসন্দেহে আরও বাড়িয়ে দেয়।


দুপুরের খাবার ও কিছুটা বিশ্রাম শেষে আমরা চলে এলাম Airbnb-এর মাধ্যমে আগে থেকে বুক করা আমাদের থাকার বাসায়। নতুন শহরে দীর্ঘদিনের জন্য নয়, মাত্র কয়েক দিনের জন্য এসেছি—তাই যতটা সম্ভব শহরটাকে কাছ থেকে দেখার ইচ্ছা ছিল প্রবল। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বিকেলের দিকে বেরিয়ে পড়লাম লিওনের পথে।


এই সফরে আমার সঙ্গী আমার মেয়ে নুসরাত নাওমী। বাবা-মেয়ের একসঙ্গে বিদেশের নতুন শহর আবিষ্কারের আনন্দই আলাদা। রাস্তার দৃশ্য, মানুষের চলাচল, মেট্রোর ব্যস্ততা—সবকিছুই নাওমীর কাছে ছিল নতুন। আমিও চেষ্টা করছিলাম পর্যটকের চোখে নয়, বরং একটু কাছ থেকে লিওনকে অনুভব করতে।


শহর ঘোরার সুবিধার জন্য আমরা ব্যবহার করলাম লিওনের গণপরিবহন ব্যবস্থা। gare de Vaise  স্টেশনে গিয়ে আমরা সাত দিনের একটি ট্রান্সপোর্ট পাস সংগ্রহ করি। জনপ্রতি এর মূল্য পড়ে ২৩.৪০ ইউরো। সাত দিনের জন্য এই পাসের মাধ্যমে লিওনের বিভিন্ন গণপরিবহন ব্যবহার করার সুযোগ থাকায় শহর ঘোরার পরিকল্পনাটা অনেক সহজ হয়ে গেল। মেট্রো ও বাসের পাশাপাশি নির্দিষ্ট নদীপথের পরিবহন ব্যবহারের সুবিধাও রয়েছে। ফলে কয়েক দিনের সফরে শহরের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে দেখার জন্য এটি বেশ কার্যকর একটি ব্যবস্থা বলে মনে হলো।


Grange Blanche স্টেশনেই আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন তানজীম ভাই। তিনি লিওনে বসবাস করেন এবং দেশে সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নতুন শহরে পরিচিত একজনের সঙ্গ পাওয়া সবসময়ই আনন্দের। তাঁর সঙ্গে গল্প করতে করতে আমাদের পরবর্তী গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চললাম।


এরপর সারওয়ার ভাই আমাদের নিয়ে গেলেন লিওনের অন্যতম বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান ফুভিয়ে পাহাড় (Fourvière Hill)-এ। লিওন শহরের সৌন্দর্য এক নজরে দেখতে চাইলে ফুভিয়ে পাহাড় নিঃসন্দেহে অন্যতম সেরা স্থান।


ফুভিয়ে পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে বিখ্যাত Basilica of Notre-Dame de Fourvière। এর আশপাশ থেকে নিচের দিকে তাকালে পুরো লিওন শহর যেন চোখের সামনে মেলে ধরে তার বিস্তৃত রূপ। শহরের বুক চিরে বয়ে চলা রোন (Rhône) ও সোন (Saône) নদী, পুরোনো ও নতুন স্থাপত্যের সমন্বয় এবং দূর পর্যন্ত বিস্তৃত নগরজীবন—সবকিছু একসঙ্গে দেখা যায় এখান থেকে। আকাশ পরিষ্কার থাকলে দূরে আল্পস পর্বতমালার দৃশ্যও উপভোগ করা যায়।


আমরা যখন ফুভিয়ে পাহাড়ে পৌঁছালাম, তখন রাত অনেক হয়ে গেছে। কিন্তু রাতের লিওন যেন একেবারেই অন্যরকম। চারদিকে অসংখ্য আলোর ঝিলিক, নিচে বিস্তৃত শহর আর নদীর আঁকাবাঁকা রেখা—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে আমরা যেন একটি বিশাল আলোকচিত্র দেখছি।


দিনের ব্যস্ততা পেরিয়ে রাতের নীরবতায় ফুভিয়ে থেকে লিওনকে দেখা ছিল আমাদের প্রথম দিনের সবচেয়ে স্মরণীয় অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। একটি শহরকে শুধু তার রাস্তায় হেঁটে নয়, কখনো কখনো একটু উঁচুতে উঠে দেখতেও হয়। তখন শহরটির বিস্তার, সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্য একসঙ্গে চোখে ধরা দেয়।


সেখানে কিছু সময় কাটানোর পর হলো আরেকটি ছোট্ট আনন্দ—আইসক্রিম। বাবা-মেয়ের ভ্রমণে এমন ছোট ছোট মুহূর্তই শেষ পর্যন্ত বড় স্মৃতি হয়ে থাকে। নুসরাতের সঙ্গে সেই আইসক্রিম খাওয়ার মুহূর্তটিও আমাদের লিওন সফরের প্রথম দিনের স্মৃতিতে আলাদা করে জায়গা করে নিল।


প্রথম দিনের এই ভ্রমণে সারওয়ার ভাইয়ের আন্তরিকতা এবং তানজীম ভাইয়ের সঙ্গ আমাদের পথচলাকে আরও আনন্দময় করে তুলেছিল। বিদেশের মাটিতে পরিচিত মানুষের সহযোগিতা শুধু ভ্রমণকে সহজই করে না, অচেনা শহরকেও অনেকটা আপন করে তোলে।


একটি দিনেই কত কিছু দেখা হয়ে গেল—TGV স্টেশনে আগমন, আপনজনের আতিথেয়তা, নতুন বাসায় ওঠা, মেট্রোতে শহর ঘোরা, পরিচিতজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং সবশেষে ফুভিয়ে পাহাড় থেকে রাতের আলোয় লিওন দেখা। মনে হলো, লিওনকে জানার যাত্রা মাত্র শুরু হলো।


সামনে আরও কয়েকটি দিন। অপেক্ষায় রয়েছে লিওনের পুরোনো অলিগলি, ঐতিহাসিক স্থাপনা, নদীর তীর, খাবার, মানুষের জীবনযাপন আর অজানা আরও কত গল্প। প্রতিটি দিন হয়তো খুলে দেবে লিওনের নতুন কোনো দরজা।


ইনশাআল্লাহ, সেই নতুন দিনের নতুন অভিজ্ঞতা নিয়েই আবার শুরু হবে আমাদের লিওন-ভ্রমণের গল্প। 



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ