০৮ অক্টোবর ২০২৬ ,  ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

লিওন ভ্রমণ — ২য় পর্ব

নৌভ্রমণ, ইতিহাস, শিল্প আর সরওয়ার ভাইয়ের আন্তরিক আতিথেয়তা

মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম
আপলোড সময় : ১৯-০৮-২০২৬
নৌভ্রমণ, ইতিহাস, শিল্প আর সরওয়ার ভাইয়ের আন্তরিক আতিথেয়তা



লিওন ভ্রমণের দ্বিতীয় দিনটি ছিল আমাদের জন্য দারুণ বৈচিত্র্যময় ও স্মরণীয়। একদিকে ছিল নদীপথে শহর দেখার আনন্দ, অন্যদিকে লিওনের ইতিহাস, রোমান স্থাপত্য, শিল্প ও সংস্কৃতিকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ। আর পুরো দিনের আনন্দকে আরও বিশেষ করে তুলেছিলেন আমাদের প্রিয় সরওয়ার ভাই।

সরওয়ার ভাই শুধু আমাদের ঘুরিয়েই দেখাননি, প্রতিটি জায়গার ইতিহাস ও পটভূমিও অত্যন্ত সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন। তাঁর কাছ থেকে লিওনের ইতিহাস শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, আমরা যেন শুধু একটি শহর ঘুরছি না—বরং ইতিহাসের পাতার ভেতর দিয়ে হাঁটছি।

নৌভ্রমণ দিয়ে দিনের শুরু

সকালে আমরা প্রথমেই নৌভ্রমণে বের হলাম। লা বরদ  থেকে একটি ইঞ্জিনচালিত বোটে উঠলাম। নদীপথে কয়েকটি স্টপেজ পার হয়ে আমরা পৌঁছালাম বেলকুরে (Bellecour)।

বেলকুরে নেমেই চোখে পড়ল বিশাল সুন্দর একটি পার্ক ও খোলা প্রাঙ্গণ। সেখানে কৃত্রিম ফুলের গাছসহ নানা ধরনের নান্দনিক সাজসজ্জা করা ছিল। কাপড় ও বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে পুরো পার্কটিকে এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যে জায়গাটি দেখতে বেশ উৎসবমুখর ও আকর্ষণীয় লাগছিল।

বেলকুর লিওনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাণবন্ত এলাকা। চারপাশে মানুষের চলাচল, সুন্দর স্থাপত্য, নদীর পরিবেশ—সব মিলিয়ে জায়গাটির মধ্যে আলাদা একটা প্রাণ আছে।

এরপর নদীর তীরে এসে আমরা বিশাল আকৃতির একটি জাহাজ দেখতে পেলাম। নদীর দুই পাশের দৃশ্য এবং সামনে থেকে লিওনের প্রতীকী স্থাপত্যগুলো দেখতে বেশ চমৎকার লাগছিল। নদী, জাহাজ ও শহরের স্থাপত্য—সবকিছু মিলিয়ে দৃশ্যটি ছিল অসাধারণ।

সেখান থেকে আমরা আরও বেশ কিছু এলাকা ঘুরে দেখলাম এবং লিওনের সৌন্দর্য উপভোগ করলাম।

দুপুরের বিরতি ও সরওয়ার ভাইয়ের পরিবারের আন্তরিকতা

দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দুপুরের দিকে আমরা বাসায় ফিরে এলাম। দুপুরের খাবার খেয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। এরপর বিকেলের দিকে আবার বের হওয়ার প্রস্তুতি নিলাম।

এই সময় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন সরওয়ার ভাই। তিনি তাঁর দুই ছেলে জিসান ও আইমানকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন।

লিওনে আসার প্রথম দিনেই জিসান, আইমান ও জারার সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়েছিল। প্রথম দেখাতেই ওরা আমাদের সঙ্গে খুব সহজভাবে মিশে গিয়েছিল। ছোট্ট জিসানের বয়স প্রায় পাঁচ-ছয় বছর, আর আইমানের বয়স মাত্র তিন বছর। ছোট্ট আইমানের প্রাণবন্ত উপস্থিতি আমাদের খুব ভালো লেগেছিল।



আর জারা এবার খুবই ভালো—বুভে গ্লোরিয়াস—রেজাল্ট করেছে, যা শুনে আমরা সত্যিই আনন্দিত হয়েছি।

সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় ছিল, বাচ্চারা আমাদের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গিয়েছিল যেন আমরা অনেক দিনের পরিচিত। ভ্রমণের মধ্যে এ ধরনের আন্তরিক সম্পর্ক তৈরি হওয়া সত্যিই আনন্দের।

সরওয়ার ভাইয়ের স্ত্রী ভাবির সঙ্গেও আমাদের সরাসরি দেখা করার সুযোগ হয়নি। তিনি ফার্মাসিউটিক্যালসের একটি ট্রেনিংয়ে ব্যস্ত থাকায় আমাদের সঙ্গে সময় দিতে পারেননি।

কিন্তু দেখা না হলেও তাঁর আন্তরিকতা আমরা গভীরভাবে অনুভব করেছি।

আমরা লিওনে পৌঁছানোর প্রথম দিন দুপুরে যে খাবার খেয়েছিলাম, তার আয়োজন ছিল ভাবির আন্তরিক আতিথেয়তারই অংশ। ব্যস্ততার কারণে তিনি আমাদের সঙ্গে থাকতে পারেননি, কিন্তু রাতের খাবারও তৈরি করে রেখে দিয়েছিলেন, যাতে আমরা তাঁর ভালোবাসা ও যত্ন থেকে বঞ্চিত না হই।

মানুষের ভালোবাসা সব সময় সরাসরি দেখা বা কথাবার্তার মাধ্যমে প্রকাশ পায় না। কখনো কখনো যত্নের ছোট ছোট কাজই অনেক বড় ভালোবাসার প্রকাশ হয়ে ওঠে। ভাবির সেই আন্তরিকতা আমরা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি।


রোমান ইতিহাসের এক অসাধারণ অধ্যায়

এরপর সরওয়ার ভাই আমাদের গাড়িতে করে নিয়ে গেলেন ফোরভিয়ের (Fourvière) এলাকার দিকে। সেখানে গিয়ে আমরা লিওনের প্রাচীন ইতিহাসের এক অসাধারণ নিদর্শনের সামনে দাঁড়ালাম—রোমান থিয়েটার।

বর্তমানে এই স্থানটি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, থিয়েটার ও কনসার্টের জন্যও ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এক সময় এই স্থান ছিল গ্রিক ও রোমান রাজা-বাদশাহদের বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্র।

তারা এখানে বিভিন্ন ধরনের বিনোদন উপভোগ করতেন। এমনকি বন্দী ও আসামিদের বাঘের সামনে ছেড়ে দিয়ে তাদের নির্মম পরিণতি দেখে বিনোদন উপভোগ করার ঘটনাও ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

সেই সময়ের নির্মমতার কথা ভাবলে আজও গা শিউরে ওঠে। অথচ সেই ঘটনার নীরব সাক্ষী হয়ে প্রাচীন স্থাপত্যের পাথরের আসন, মঞ্চ ও ধ্বংসাবশেষগুলো আজও দাঁড়িয়ে আছে।

হাজার হাজার বছর আগে নির্মিত এই স্থাপত্যের সামনে দাঁড়িয়ে সত্যিই বিস্মিত হতে হয়। সেই সময়ের মানুষের নির্মাণকৌশল, স্থাপত্যজ্ঞান ও পরিকল্পনা কতটা উন্নত ছিল, এখানে না এলে হয়তো তা এত গভীরভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব হতো না।

আর এই জায়গাটির আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ হলো—উঁচু স্থান থেকে লিওন শহরের অসাধারণ দৃশ্য দেখা যায়।

আমরা সেখানে বেশ কিছু সময় কাটালাম, অনেক ছবি তুললাম এবং চারপাশের সৌন্দর্য উপভোগ করলাম।

লিওনের বিখ্যাত বিশাল মুরাল

এরপর আমরা গেলাম লিওনের আরেকটি বিখ্যাত আকর্ষণ দেখতে—বিশাল দেয়ালজুড়ে আঁকা চমৎকার মুরাল বা দেওয়ালচিত্র।

পুরো একটি ভবনের দেয়ালকে এমনভাবে শিল্পকর্মে রূপ দেওয়া হয়েছে যে দূর থেকে দেখলে মনে হয় ভবনের জানালা, বারান্দা ও দরজার সামনে সত্যিকারের মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।

কেউ কাজ করছে, কেউ কথা বলছে, কেউ জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে—কিন্তু কাছে গিয়ে বোঝা যায়, সবই অসাধারণ শিল্পকর্ম।

লিওনের শিল্প, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার নানা দিককে এই বিশাল মুরালের মাধ্যমে তাঁত শিল্পের শুরু ও পরবর্তী অবস্থার কথা তুলে ধরা হয়েছে। একটি পুরো ভবনকে শিল্পের ক্যানভাসে পরিণত করার এই ধারণাটি সত্যিই চমৎকার।

দেয়ালের বিশাল অংশজুড়ে বিস্তৃত এই শিল্পকর্ম শুধু একটি ছবি নয়; এটি যেন একটি শহরের গল্প।

লিওনে আসা পর্যটকদের কাছে এই স্থানটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। আমরাও সেখানে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে শিল্পকর্মটি দেখলাম, ছবি তুললাম এবং এর সৌন্দর্য উপভোগ করলাম।

লেকের পাশে কিছুটা প্রশান্তি

মুরাল দেখে আমরা এরপর গেলাম একটি সুন্দর লেকের কাছে।

শহরের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা দূরে এসে লেকের পাশে দাঁড়ালে পরিবেশটাই যেন বদলে যায়। শান্ত পানি, চারপাশের সবুজ, খোলা আকাশ ও নিরিবিলি পরিবেশ—সব মিলিয়ে সেখানে আমরা বেশ কিছু সময় কাটালাম।

সারাদিনের হাঁটাহাঁটি ও দর্শনীয় স্থান দেখার পর এই সময়টুকু ছিল আমাদের জন্য বেশ প্রশান্তির।

সুস্বাদু পিজ্জা দিয়ে দিনের আনন্দ

লেকের পাড় ঘুরে আমরা এরপর গেলাম একটি চমৎকার রেস্টুরেন্টে। সেখানে সরওয়ার ভাই আমাদের পিজ্জা খাওয়ালেন।

রেস্টুরেন্টটির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল—সামনে বিভিন্ন ধরনের কার্ড/মেনু দেখে পছন্দ করার ব্যবস্থা। আমরা সেখান থেকে একটি বিশেষ পিজ্জা খেলাম।

সত্যি বলতে, পিজ্জাটি ছিল অত্যন্ত সুস্বাদু। সারাদিনের ঘোরাঘুরির পর এমন একটি চমৎকার খাবার আমাদের দিনের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দিল।

সরওয়ার ভাইয়ের এই আমন্ত্রণ ও আন্তরিকতার জন্য আমরা তাঁর কাছে আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।



নাওমীর অসুস্থতা ও মেট্রো স্টেশনে বিদায়

খাওয়া-দাওয়া শেষে আমরা আবার গাড়িতে উঠলাম। এ সময় আমার মেয়ে নাওমী কিছুটা অসুস্থবোধ করছিল।

সরওয়ার ভাই বিষয়টি বুঝতে পেরে আমাদের সুবিধার কথা চিন্তা করলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি আমাদের একটি মেট্রো স্টেশনে পৌঁছে দিলেন, যাতে আমরা সহজে মেট্রোতে করে ফিরে যেতে পারি।

আমাদের আগে থেকেই মেট্রো, বাস ও অন্যান্য পরিবহনের জন্য টিকিট/কার্ডের ব্যবস্থা করা ছিল। তাই সেখান থেকে আমরা মেট্রোতে করে ফেরার ব্যবস্থা করলাম।

লিওন ভ্রমণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ


এই ভ্রমণের মধ্য দিয়ে আমরা একটি বিষয় বুঝতে পেরেছি—লিওনে যারা ঘুরতে আসবেন, তারা সম্ভব হলে লিওন ট্যুরিজম অফিসে গিয়ে ট্যুরিস্ট/সিটি পাস সম্পর্কে অবশ্যই খোঁজ নেবেন।

আমরা শুরুতে আলাদা আলাদাভাবে পরিবহনের ব্যবস্থা করেছিলাম। পরে জানতে পারলাম, পর্যটকদের জন্য এমন একটি পাস রয়েছে, যার মাধ্যমে পরিবহনের পাশাপাশি বিভিন্ন মিউজিয়াম ও দর্শনীয় স্থানেও সুবিধা পাওয়া যায়।

অর্থাৎ সঠিক ট্যুরিস্ট পাস নিলে লিওন ঘোরার ক্ষেত্রে অনেক কিছুই সহজ ও সাশ্রয়ী হতে পারে।

তাই যারা ভবিষ্যতে লিওনে আসবেন, তাদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ—শুরুতেই ট্যুরিজম অফিসে গিয়ে কোন পাসটি আপনাদের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক হবে, তা জেনে নিন।



সরওয়ার ভাই—আমাদের ভ্রমণের বিশেষ একজন মানুষ

আমাদের এই ভ্রমণের সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলোর একটি ছিল সরওয়ার ভাইয়ের সঙ্গ।

লিওনের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে গেলে শুধু জায়গা দেখা আর ইতিহাস জানা এক বিষয় নয়। একজন অভিজ্ঞ মানুষ যখন প্রতিটি স্থানের ইতিহাস, পটভূমি ও তাৎপর্য নিজের ভাষায় বুঝিয়ে দেন, তখন ভ্রমণের আনন্দ অনেকগুণ বেড়ে যায়।

সরওয়ার ভাই লিওনের ইতিহাস ও বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে অনেক কিছু জানেন। কোথায় কী ঘটেছিল, কোন স্থানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব কী—তিনি অনেক কিছুই অত্যন্ত সাবলীলভাবে বলতে পারেন।

তাঁর এই জ্ঞান, সময় দেওয়া এবং আন্তরিকতা আমাদের সফরকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

একজন ভালো গাইড যেমন শুধু রাস্তা দেখান না, বরং একটি শহরকে চিনতে সাহায্য করেন—সরওয়ার ভাই আমাদের জন্য ঠিক তেমনই একজন সহযাত্রী হয়ে উঠেছিলেন।

দ্বিতীয় দিনের সমাপ্তি


এভাবেই নৌভ্রমণ দিয়ে শুরু হওয়া আমাদের দ্বিতীয় দিন শেষ হলো ইতিহাস, স্থাপত্য, শিল্প, লেকের সৌন্দর্য, সুস্বাদু খাবার এবং মানুষের আন্তরিক ভালোবাসায়।

একটি ভ্রমণ শুধু নতুন জায়গা দেখার নাম নয়। ভ্রমণের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে মানুষের সঙ্গে পরিচয়ে, নতুন সংস্কৃতিকে জানায়, ইতিহাসের গল্প শোনায় এবং অচেনা শহরে পরিচিত মানুষের মতো আপন কাউকে পাশে পাওয়ায়।

লিওনে আমাদের এই দ্বিতীয় দিনটি তাই শুধু দর্শনীয় স্থান দেখার দিন ছিল না; এটি ছিল ইতিহাসকে দেখা, শিল্পকে অনুভব করা এবং মানুষের ভালোবাসাকে কাছ থেকে পাওয়ার একটি দিন।

আলহামদুলিল্লাহ, এভাবেই শেষ হলো আমাদের লিওন সফরের দ্বিতীয় দিন।

আগামী পর্বে ইনশাআল্লাহ তুলে ধরব আমাদের তৃতীয় দিনের নতুন অভিজ্ঞতা—কোথায় গেলাম, কী দেখলাম এবং লিওনের আর কী কী সৌন্দর্য আমাদের অপেক্ষায় ছিল।

সবাই আমাদের ভ্রমণ স্মৃতির সঙ্গে থাকবেন। 



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ