লিয়ঁ ভ্রমণের চতুর্থ দিনটি শুরু হয়েছিল একটু দেরিতে। আগের রাতের ব্যস্ততা এবং দেরিতে ঘুমানোর কারণে সকালে আর তাড়াহুড়ো করে বের হওয়া হয়নি। ফলে দিনের শুরুটা কিছুটা ধীরগতিতেই এগোয়। অবশেষে সাড়ে দুইটার দিকে আমাদের প্রস্তুতি শেষ হয়, এবং কিছুক্ষণ পর বিকেল প্রায় চারটার দিকে আমরা দিনের ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ি।
শহরের বাসা থেকে বের হয়ে প্রথমেই আমরা রওনা দিই লিয়ঁর অন্যতম ব্যস্ত ও আধুনিক শপিং গন্তব্য Westfield La Part-Dieu-এর দিকে। শহরের কোলাহল পেরিয়ে যখন আমরা সেখানে পৌঁছাই, তখন পরিবেশ একেবারেই বদলে যায়।
আধুনিক শহুরে ব্যস্ততার মাঝে Westfield
Westfield La Part-Dieu শুধু একটি শপিং মল নয়, বরং লিয়ঁর আধুনিক নগরজীবনের প্রতিচ্ছবি। বিশাল পরিসর, ঝলমলে সাজসজ্জা এবং বিশ্বের নামী-দামি ব্র্যান্ডের সমাহার—সব মিলিয়ে এখানে কিছুটা সময় কাটানোই ছিল আমাদের প্রথম অভিজ্ঞতা।
এখানেই আমরা কিছু কেনাকাটাও করি। বিশেষ করে পরিবারের জন্য এবং মেয়ের জন্য দুটি জামা কেনা হয়। কিছুটা সময় এখানে কাটানোর পর, এবার আমাদের পরবর্তী গন্তব্যের দিকে যাত্রা শুরু হয়—যা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরিবেশ, সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগৎ।
শহর থেকে প্রকৃতির দিকে যাত্রা
Westfield-এর আধুনিক ব্যস্ততা পেছনে ফেলে আমরা যখন পরবর্তী গন্তব্যের দিকে এগোতে থাকি, তখন ধীরে ধীরে শহরের কোলাহল কমে আসে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই লিয়ঁর বিখ্যাত সবুজ উদ্যান Parc de la Tête d’Or-এ।
লিয়ঁর সবুজ হৃদয়ে
পার্কে প্রবেশ করতেই যেন পরিবেশ একেবারে বদলে যায়। প্রায় ১০৫ হেক্টরজুড়ে বিস্তৃত এই বিশাল নগর উদ্যান লিয়ঁ শহরের মাঝখানে এক অসাধারণ সবুজ আশ্রয়।
এখানে ঢুকলে প্রথমেই চোখে পড়ে বিশাল পুরোনো গাছ, প্রশস্ত সবুজ মাঠ এবং ছায়াঘেরা হাঁটার পথ। কিছুটা এগোতেই দেখা মেলে শান্ত হ্রদের জলরাশি। শহরের এত কাছে থেকেও এমন নীরব ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সত্যিই অবাক করার মতো।
এই পার্কের ইতিহাসও বেশ সমৃদ্ধ। ১৮৫৭ সালে এটি সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। Denis ও Eugène Bühler ইংরেজি বাগানধারার অনুপ্রেরণায় এর নকশা তৈরি করেন।
আর ‘Tête d’Or’ নামটির পেছনে রয়েছে একটি পুরোনো কিংবদন্তি—যেখানে বলা হয়, এই এলাকায় কোথাও সোনার তৈরি যিশুখ্রিস্টের একটি মাথা লুকানো ছিল। সেই থেকেই এই নামের প্রচলন।
পার্কের ভেতরে চিড়িয়াখানার জগৎ
পার্কের ভেতরেই রয়েছে এর অন্যতম আকর্ষণ Parc zoologique বা চিড়িয়াখানা। কিছুটা হাঁটার পর আমরা সেখানে পৌঁছাই।
১৮৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই চিড়িয়াখানা ফ্রান্সের প্রাচীনতম চিড়িয়াখানাগুলোর একটি। এখানে প্রায় ৪০০ প্রাণী এবং প্রায় ৬০টি প্রজাতি রয়েছে।
বিশেষ করে African Plain অংশটি খুবই আকর্ষণীয়, যেখানে জিরাফ, অ্যান্টিলোপসহ আফ্রিকার বিভিন্ন প্রাণীর জন্য প্রাকৃতিক পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। এরপর রয়েছে Asian Forests, যেখানে এশিয়ার বনভূমির আদলে পরিবেশ তৈরি করে বিপন্ন প্রাণী সংরক্ষণ ও প্রজননের কাজ করা হয়।
এই পুরো অভিজ্ঞতা আমাদের কাছে শুধু বিনোদন নয়, বরং প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে একটি সচেতনতার বার্তাও নিয়ে আসে।
পার্কের ভেতরে আরও রয়েছে Botanical Garden, গোলাপের বাগান এবং বিশাল হ্রদ। সব মিলিয়ে এখানে একটি দিন কাটালেও যেন শেষ হয় না।
কিন্তু সময় সীমিত থাকায় আমরা ধীরে ধীরে পার্ক থেকে বেরিয়ে আসি। কারণ আমাদের সামনে অপেক্ষা করছিল দিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সন্ধ্যার দিকে নতুন গন্তব্য
এবার সূর্য ধীরে ধীরে অস্ত যেতে শুরু করেছে। আর আমরা রওনা দিই ইকবাল ভাইয়ের বাসার দিকে, যেখানে আমাদের জন্য একটি বিশেষ দাওয়াতের আয়োজন ছিল।
যাওয়ার পথে আমরা প্রথমে ট্রাম, তারপর মেট্রো এবং পরে বাসে যাওয়ার পরিকল্পনা করি। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলে পরিস্থিতি বদলে যায়।
ঠিক তখনই সোহান ভাই ফোন করে জানান, তারা গাড়ি নিয়ে আমাদের নিতে আসছেন। কিছুক্ষণ পর ইকবাল ভাইসহ তারা এসে আমাদের নিয়ে যান। ফলে যাত্রাটা আরও সহজ হয়ে যায়।
শেষ পর্যন্ত আমরা রাত প্রায় দশটার দিকে ইকবাল ভাইয়ের বাসায় পৌঁছাই।
প্রবাসে এক টুকরো বাংলাদেশ
বাসায় ঢুকতেই ক্লান্তি যেন মুহূর্তেই হারিয়ে যায়। কারণ সেখানে তখন একে একে সবাই উপস্থিত হচ্ছেন, আর পরিবেশ ধীরে ধীরে একেবারে পারিবারিক মিলনমেলায় রূপ নিচ্ছে।
সেখানে আগে থেকেই ছিলেন শারমিন আক্তার, যিনি পারভেজ ভাইয়ের স্ত্রী। পারভেজ ভাই তখনও আসেননি, তিনি পরে এসে যোগ দেন।
শারমিন আক্তারের সঙ্গে তাঁদের তিন সন্তান ছিল—এক ছেলে ও দুই মেয়ে। তাঁদের মধ্যে আলিফ, আইদা এবং আফসা উপস্থিত ছিল।
ইকবাল ভাইয়ের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ছিলেন তাঁর দুই মেয়ে ইয়াসমিন আক্তার, এবং নাসরিন আক্তার। ফলে পুরো পরিবেশটি ধীরে ধীরে এক পারিবারিক আয়োজনে রূপ নেয়।
এরপর একে একে যোগ দেন সামিম ভাই, যিনি লিয়ঁর একজন বড় ব্যবসায়ী। তাঁর স্ত্রী রুমা ভাবি এবং তাঁদের ছেলে রেদওয়ানুলও সঙ্গে ছিলেন।
এরপর আসেন সোহান ভাই, যিনি একজন ব্যবসায়ী। তাঁর স্ত্রী কান্তা ভাবি এবং তাঁদের দুই সন্তান সোহানা ও হাসিবও উপস্থিত ছিলেন।
সবশেষে পরে এসে যোগ দেন পারভেজ ভাই, যিনি লিয়ঁতে সফলভাবে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
সবাই একসঙ্গে হওয়ার পর পুরো পরিবেশটি আর শুধু দাওয়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি—এটি রূপ নেয় এক জমজমাট দেশি আড্ডায়।
জেসমিন ভাবির আয়োজনে দেশি স্বাদ
এই পুরো আয়োজনের কেন্দ্রে ছিলেন ইকবাল ভাইয়ের স্ত্রী জেসমিন আক্তার।
তিনি আমাদের জন্য যে খাবারের আয়োজন করেছিলেন, তা সত্যিই অসাধারণ। চট্টগ্রাম, ঢাকা এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঘরোয়া স্বাদের খাবার একসঙ্গে সাজানো ছিল টেবিলে।
শুঁটকি, ভুড়ি এবং আরও নানা দেশি পদ—সবকিছুর গন্ধেই মনে হচ্ছিল আমরা যেন ফ্রান্সে নয়, বাংলাদেশের কোনো আপনজনের বাড়িতে বসে আছি।
সবাই মিলে একসঙ্গে খাবার খেলাম। খাওয়ার পাশাপাশি চলল গল্প, হাসি-ঠাট্টা এবং নানা আলোচনা। খাবার শেষ হলেও আড্ডা থামার কোনো নামই নেই।
দেশ থেকে দূরে, তবু একেবারে দেশের মতো
সামাজিক বিষয়, ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রবাস জীবন—সবকিছু নিয়েই চলল প্রাণবন্ত আলোচনা। কেউ কথা বলছেন, কেউ শুনছেন, আবার কেউ হাসছেন—সব মিলিয়ে পরিবেশ ছিল একেবারে ঘরোয়া।
দিনের শুরুতে আমরা ছিলাম আধুনিক শপিং মলে, আর শেষটা হলো একেবারে আপনজনদের ঘরোয়া আড্ডায়। এই বৈচিত্র্যই পুরো দিনটিকে বিশেষ করে তুলেছে।
রাতের নীরবতায় ফেরার পথ
একসময় ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত প্রায় বারোটা। এবার ফেরার সময় হয়েছে।
আমরা বিদায় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, তখন সামিম ভাই বললেন, তিনি নিজেই আমাদের বাসায় পৌঁছে দেবেন।
শেষ পর্যন্ত শামিম ভাই, রুমা ভাবি এবং তাঁদের ছেলে আমাদের গাড়িতে করে বাসায় পৌঁছে দেন।
রাতের লিয়ঁ তখন শান্ত, নীরব এবং আলো-আঁধারিতে ভরা। জানালা দিয়ে শহরের আলো দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, আজকের দিনটা যেন একসঙ্গে অনেকগুলো অভিজ্ঞতার গল্প।
একদিকে আধুনিক শহর, অন্যদিকে বিশাল সবুজ পার্ক, আর শেষে প্রবাসে আপনজনদের সঙ্গে দেশি আড্ডা—সব মিলিয়ে দিনটি ছিল সত্যিই অসাধারণ।
অবশেষে আমরা বাসায় ফিরে আসি। এভাবেই শেষ হয় আমাদের লিয়ঁ ভ্রমণের চতুর্থ দিন।
দিনটি শুরু হয়েছিল ধীরগতিতে, কিন্তু শেষ হয়েছে অসাধারণ অভিজ্ঞতায় ভরা এক পূর্ণ দিনের গল্প হয়ে।
তবে আমাদের সফর এখানেই শেষ নয়। সামনে অপেক্ষা করছে পঞ্চম দিনের আরও নতুন গল্প, নতুন অভিজ্ঞতা এবং নতুন গন্তব্য।
সেই গল্প নিয়ে আবারও আপনাদের সামনে আসব।
অপেক্ষায় থাকুন। আবারও কথা হবে। ধন্যবাদ।