০৮ অক্টোবর ২০২৬ ,  ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

লিওন ভ্রমণ — ৩য় পর্ব

জল, জনপদ ও প্রবাসের আপন আলো

মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম
আপলোড সময় : ২৩-০৮-২০২৬
জল, জনপদ ও প্রবাসের আপন আলো




ভ্রমণের তৃতীয় দিনটি শুরু হয়েছিল জলের হাত ধরে। লিওনের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে চলা ইঞ্জিনচালিত নৌকা, আধুনিক নগরজীবনের ব্যস্ততা, বিশাল জলরাশি, প্রবাসী স্বজনদের উষ্ণতা আর দিনশেষে ঘরে ফেরার দীর্ঘ পথ—সব মিলিয়ে দিনটি যেন ছিল একসঙ্গে অনেকগুলো গল্পের সমাহার।

প্রতিটি দিনই ভ্রমণে নতুন কিছু শেখায়। তবে কোনো কোনো দিন শুধু দৃশ্যের কারণে নয়, মানুষের আন্তরিকতার কারণে মনে গেঁথে যায়। আমাদের লিওন সফরের তৃতীয় দিনটি ছিল তেমনই একটি দিন।

নদীপথে কনফ্লুয়েন্সের পথে


সকালের শুরুতেই আমরা ইঞ্জিনচালিত নৌকায় চড়ে রওনা হলাম কনফ্লুয়েন্সের দিকে।

নদীর বুক চিরে নৌকা এগিয়ে চলছিল। দুই পাশে লিওনের নগরজীবন, দূরে আধুনিক স্থাপত্য, আর নদীর ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মৃদু বাতাস—সব মিলিয়ে পথটুকুও যেন হয়ে উঠেছিল ভ্রমণেরই একটি আলাদা অধ্যায়।

কনফ্লুয়েন্সে পৌঁছে আমরা গেলাম সেখানকার বিশাল বাণিজ্যিক কেন্দ্রে। বড় বড় ব্র্যান্ডের অসংখ্য দোকান, মানুষের ব্যস্ত চলাচল এবং আধুনিক সাজসজ্জা দেখে বোঝা যায়, লিওনের ঐতিহাসিক পরিচয়ের পাশাপাশি আধুনিক বাণিজ্যিক জীবনও কতটা সমৃদ্ধ।

আমরা বেশ কিছুক্ষণ সেখানে ঘুরলাম। কখনো দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে, কখনো মানুষের ব্যস্ততা দেখে—সময়ের অজান্তেই বেশ খানিকটা সময় কেটে গেল।


সোহান ভাইয়ের দোকানে আপন আড্ডা

কনফ্লুয়েন্সের ঘোরাঘুরি শেষে আমরা গেলাম সোহান ভাইয়ের দোকানে।
প্রবাসের শহরে পরিচিত কোনো মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়ার অনুভূতিটা সবসময়ই আলাদা। বিদেশের মাটিতে নিজের ভাষায় কথা বলা, পরিচিত মুখের হাসি দেখা—এসব ছোট ছোট মুহূর্তও ভ্রমণকে অন্যরকম করে তোলে।

সোহান ভাইয়ের সঙ্গে গল্প করতে করতে দুপুর হয়ে গেল। এ সময় পাপন ভাইও আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন।

তারপর একসঙ্গে দুপুরের খাবার খেলাম। ফ্রান্সের মাটিতে তুর্কিশ খাবারের স্বাদও নিলাম। ভ্রমণের আনন্দে খাবারেরও যেন আলাদা স্বাদ থাকে—অচেনা শহরে নতুন স্বাদ, পরিচিত মানুষের সঙ্গে বসে খাওয়া, আর সামনে থাকে আরও একটি নতুন গন্তব্যের অপেক্ষা।

মিরবেল—সমুদ্রের মতো এক লেক

দুপুরের পর আমাদের গন্তব্য মিরবেল লেক।

দূর থেকে লেকটির বিশাল জলরাশি দেখে প্রথমে মনে হয়, এ যেন সমুদ্র! অথচ এটি সমুদ্র নয়—একটি বিশাল লেক। এর বিস্তৃতি, জলরাশির গভীর নীলতা এবং চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ মিলে জায়গাটিকে অসাধারণ করে তুলেছে।

এখানে রয়েছে প্রাইভেট ও পাবলিক—দুই ধরনের ব্যবস্থা। আমরা প্রবেশমূল্য দিয়ে প্রাইভেট অংশে ঢুকলাম।

কিন্তু আমাদের হাতে সময় ছিল খুবই কম। সেখানে পৌঁছাতে দেরি হয়ে যাওয়ায় ভেতরে গিয়ে হাতে পেলাম মাত্র প্রায় এক ঘণ্টা।

এক ঘণ্টা—এত বড় একটি জায়গার জন্য খুবই অল্প সময়। তবু ভ্রমণ তো থেমে থাকে না; অল্প সময়ের মধ্যেই যতটুকু সম্ভব, চোখে-মনে ধারণ করে নেওয়ার চেষ্টা করলাম।




জল, শিশু আর আনন্দের আয়োজন

মিরবেল লেকে শিশুদের জন্য রয়েছে নানা ধরনের বিনোদনের ব্যবস্থা। খেলাধুলার জায়গা, সাঁতার কাটার সুযোগ, ছোট-বড় বিভিন্ন ধরনের নৌকা—সব মিলিয়ে পর্যটক ও দর্শনার্থীদের জন্য বেশ সুন্দর আয়োজন।

আমরাও কিছুটা পানিতে নামলাম।

চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম, প্রকৃতি এখানে নিজের মতো করেই সাজানো। লেকের পানিতে মাছ দেখা যায়, আর চারপাশে দেশীয় হাঁসের অবাধ বিচরণ।

মানুষের তৈরি বিনোদনের আয়োজনের সঙ্গে প্রকৃতির এই স্বাভাবিক উপস্থিতি জায়গাটিকে আরও সুন্দর করে তুলেছে।

সময় আমাদের বেঁধে দিয়েছিল, তাই পুরোটা উপভোগ করার সুযোগ হয়নি। কিন্তু কখনো কখনো অল্প সময়ের দেখা দৃশ্যও দীর্ঘদিন মনে থাকে।

মিরবেলের সেই জলরাশি, হাঁসের সারি আর পানিতে নেমে কাটানো অল্প কিছু মুহূর্ত আমাদের তেমনই একটি স্মৃতি হয়ে রইল।

 সময়ের সঙ্গে পাল্লা

আমাদের শেষ বাস ছাড়ার সময় ছিল রাত ৮টা ২৩ মিনিট।

তাই আর বেশি সময় নষ্ট না করে দ্রুত বের হয়ে বাস ধরলাম। ভ্রমণে সময়ের হিসাবটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। একটি বাস মিস হলে পরের পরিকল্পনাও বদলে যেতে পারে।

বাসে করে আমরা এগিয়ে চললাম আরেকটি লেকের দিকে। এই লেকটির গুরুত্ব আবার অন্যরকম। এখানকার পানি শোধন করে লিওন শহরে সরবরাহ করা হয়।

একদিকে প্রকৃতির সৌন্দর্য, অন্যদিকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজন মেটানোর বাস্তব ব্যবস্থা—লেকটির এই দুই পরিচয় আমাদের কাছে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ মনে হলো।


সোহান ভাইয়ের বাসায় দেশের ঘ্রাণ!

দিনের শেষ ভাগে আমরা পৌঁছালাম সোহান ভাইয়ের বাসায়।
দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই যেন ক্লান্তির ওপর এক মুঠো আপন আলো এসে পড়ল।
আমাদের জন্য আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন প্রবীণ অধিবাসী ইকবাল ভাই এবং আরও দু-একজন অতিথি।
সোহান ভাই ও তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে খাবারের যে আয়োজন করা হয়েছিল, তা ছিল সত্যিই বিস্ময়কর।
টেবিলে সাজানো দেশীয় নানা ধরনের খাবার। বিদেশের মাটিতে নিজের দেশের খাবারের ঘ্রাণ কখনো কখনো শুধু ক্ষুধা মেটায় না—মনের ভেতরেও দেশের কথা জাগিয়ে তোলে।

সেদিনের খাবার তাই শুধু খাবার ছিল না; ছিল প্রবাসে বাংলাদেশের এক টুকরো স্বাদ।

 

দেখা না হয়েও আপন হয়ে যাওয়া

সোহান ভাইয়ের ভাবির সঙ্গে আমাদের আগে কখনো দেখা হয়নি।

কিন্তু সেদিন তাঁর আন্তরিকতা দেখে মনে হলো, পরিচয় যেন আজকের নয়—অনেক দিনের।

মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের জন্য সব সময় দীর্ঘ পরিচয়ের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো একটি আন্তরিক হাসি, এক প্লেট খাবার কিংবা “আরও একটু নিন”—এই ছোট্ট কথাটিই অপরিচিত মানুষকে আপন করে দেয়।

সেদিন ভাবির আতিথেয়তায় আমরা সেই আপন করে নেওয়ার অনুভূতিটিই পেয়েছি।

সোহানা ও ছোট্ট সঙ্গীরা

সোহান ভাইয়ের মেয়ে সোহানা এবং তাঁর ছেলেটিও খুব সহজেই আমাদের সঙ্গে মিশে গেল।

বাচ্চাদের হাসি, গল্প আর ছোট ছোট দুষ্টুমি ঘরের পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছিল।

কিছুক্ষণ আগেও আমরা ছিলাম একটি অচেনা শহরের পর্যটক; আর সেই ঘরে ঢোকার পর মনে হলো, আমরা যেন পরিচিত কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে বসে আছি।

 নাওমীর জন্য মায়ের মতো যত্ন

তবে সারাদিনের দীর্ঘ হাঁটাহাঁটি ও ঘোরাঘুরিতে আমার মেয়ে নাওমী বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। ফলে সে ঠিকমতো খেতে পারেনি।

ভাবি বিষয়টি লক্ষ্য করলেন।

নাওমী যেন পরে বাসায় গিয়ে খেতে পারে, সে জন্য বিভিন্ন ধরনের খাবার আলাদা করে প্যাকেট করে আমাদের হাতে তুলে দিলেন।

একজন মায়ের সন্তানকে অন্য একজন মা যেভাবে নিজের সন্তানের মতো করে ভাবতে পারেন—সেদিন আমরা সেই ভালোবাসারই একটি সুন্দর উদাহরণ দেখলাম।

এই ছোট্ট ঘটনাটি আমাদের কাছে হয়তো পুরো দিনের সবচেয়ে বড় স্মৃতিগুলোর একটি হয়ে থাকবে।


ইকবাল ভাই—প্রবাসের এক আন্তরিক মুখ!

সেদিনের আরেকটি সুন্দর স্মৃতি প্রবীণ অধিবাসী ইকবাল ভাইকে ঘিরে।

তিনি আমাদের সঙ্গে শেষ সময় পর্যন্ত ছিলেন। তাঁর সঙ্গে কথাবার্তা, আন্তরিকতা ও আপন করে নেওয়ার ভঙ্গি আমাদের খুব ভালো লেগেছে।

বিদায়ের সময়ও তাঁর আন্তরিকতার কোনো কমতি ছিল না।

বরং তিনি পরদিন আমাদের তাঁর বাসায় দাওয়াত করলেন।

এই দাওয়াতের মধ্যে শুধু খাবারের নিমন্ত্রণ ছিল না; ছিল আরও কিছুক্ষণ আপন হয়ে থাকার আহ্বান।

ভ্রমণের শেষ প্রান্তে এসে এমন একটি আন্তরিক আমন্ত্রণ পাওয়া সত্যিই আনন্দের। মনে হলো, লিওন শহর আমাদের শুধু কিছু দৃশ্যই দেয়নি; কিছু মানুষকেও দিয়েছে, যাদের ভালোবাসা সঙ্গে নিয়ে দেশে ফিরতে হবে।

ইকবাল ভাইয়ের গাড়িতে মেট্রো স্টেশনে

রাতের খাওয়া-দাওয়া ও দীর্ঘ আড্ডা শেষে আমাদের ফেরার সময় হলো।

ইকবাল ভাই তাঁর গাড়িতে করে আমাদের মেট্রো স্টেশনে পৌঁছে দিলেন।

রাত বাড়ছিল, শরীরও ক্লান্ত ছিল। কিন্তু মানুষের আন্তরিকতা ক্লান্তির ওপরও এক ধরনের প্রশান্তি এনে দেয়।

মেট্রো স্টেশন থেকে আমরা আবার মেট্রোতে করে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।

 রাত একটা—একটি দীর্ঘ দিনের শেষ


মেট্রো ও অন্যান্য পরিবহন বদলাতে বদলাতে শেষ পর্যন্ত বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় একটা বেজে গেল।

সারাদিনের দীর্ঘ পথচলা, নৌভ্রমণ, মার্কেট, লেক, হাঁটাহাঁটি, খাবার আর মানুষের ভালোবাসা—সবকিছু মিলিয়ে শরীর তখন ক্লান্ত।

কিন্তু ঘুমানোর আগে মনে হচ্ছিল, দিনটি যেন খুব দ্রুতই শেষ হয়ে গেল।

কারণ ভ্রমণের সুন্দর দিনগুলো সবসময়ই একটু দ্রুত চলে যায়।




তৃতীয় দিনের শেষে

লিওনের তৃতীয় দিন আমাদের কাছে শুধু কিছু দর্শনীয় স্থান দেখার দিন ছিল না।

এটি ছিল—

নদীর জলে ভেসে চলার দিন,
আধুনিক নগরজীবন দেখার দিন,
প্রকৃতির বিশালতার সামনে দাঁড়ানোর দিন,
আর প্রবাসের মাটিতে আপন মানুষের ভালোবাসা অনুভব করার দিন।

কনফ্লুয়েন্সের আধুনিকতা থেকে মিরবেলের বিশাল জলরাশি, সোহান ভাইয়ের পরিবারের দেশীয় খাবারের আয়োজন থেকে ইকবাল ভাইয়ের আন্তরিক দাওয়াত—সব মিলিয়ে দিনটি আমাদের ভ্রমণস্মৃতির পাতায় আলাদা একটি জায়গা করে নিল।

বিশেষ করে সোহান ভাই, ভাবি, সোহানা, তাঁর ছেলে, পাপন ভাই এবং প্রবীণ অধিবাসী ইকবাল ভাইসহ যাঁরা আমাদের সময় দিয়েছেন, ভালোবাসা দিয়েছেন এবং আপন করে নিয়েছেন—সবার প্রতি রইল আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।

ইনশাআল্লাহ, চতুর্থ দিনের সফর শেষে আবারও আপনাদের সামনে হাজির হব নতুন কোনো পথ, নতুন কোনো দৃশ্য আর নতুন কোনো গল্প নিয়ে।

ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের এই ভ্রমণকাহিনির সঙ্গে থাকবেন।

ধৈর্য ধরে পড়ার জন্য সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও ভালোবাসা।

লিওনের পথে আবারও দেখা হবে—ইনশাআল্লাহ। 



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ