০৮ অক্টোবর ২০২৬ ,  ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

লিওন ভ্রমণ: পঞ্চম পর্ব

জুমার নামাজ, ইল বার্বে কিছু সময়, প্রবাসী বাঙালির আতিথেয়তা ও স্মৃতিময় এক দিন

মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম
আপলোড সময় : ২৩-০৮-২০২৬
জুমার নামাজ, ইল বার্বে কিছু সময়, প্রবাসী বাঙালির আতিথেয়তা ও স্মৃতিময় এক দিন




লিওন ভ্রমণের পঞ্চম দিন। আগের দিনের ব্যস্ততার পর সেদিন সকালে কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে বেলা ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে আমরা বাসা থেকে বের হলাম। আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল লিওনের লাগরো এলাকার একটি বড় মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার। জুমার নামাজ আদায় করাই ছিল সেদিনের প্রধান উদ্দেশ্য।
মসজিদে পৌঁছে এর প্রশস্ত পরিসর, পরিচ্ছন্নতা ও শান্ত পরিবেশ আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ইসলামিক কার্যক্রমের পাশাপাশি সেখানে শিক্ষামূলক ও সামাজিক নানা কার্যক্রম পরিচালিত হয় বলে জানতে পারি। মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করতেই কানে ভেসে আসছিল কোরআন তিলাওয়াত। আমরা কিছুটা আগে পৌঁছেছিলাম বলে সামনের কাতারে বসার সুযোগ হয়।
কিছুক্ষণ পর প্রথম আজান দেওয়া হলো। এরপরও তিলাওয়াত চলতে থাকে। দ্বিতীয় আজানের আগে ইমাম সাহেব মুসল্লিদের সালাম দিয়ে মিম্বারে এসে বসেন। দ্বিতীয় আজানের পর শুরু হয় জুমার খুতবা।
খুতবার ভাষা সম্পর্কে আমাদের অভিজ্ঞতা ছিল কিছুটা ভিন্নধর্মী। খুতবার প্রথম অংশ আরবি ভাষায় দেওয়া হয়। পরে ফারসি ভাষায়ও বক্তব্য রাখা হয়। আলোচনার মূল বিষয় ছিল পার্থিব জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব, মানুষের নৈতিক দায়িত্ব এবং আখিরাতের প্রস্তুতি। ইমাম সাহেব স্মরণ করিয়ে দেন, দুনিয়ার সাফল্য ও সম্পদ স্থায়ী নয়; মানুষের উচিত জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং পরকালের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।
খুতবা শেষে মুসলিম উম্মাহর শান্তি, কল্যাণ ও হেদায়াতের জন্য দোয়া করা হয়। নামাজ শেষে আমরা মসজিদ থেকে বের হয়ে পরবর্তী গন্তব্যের দিকে রওনা হলাম।



প্রবাসে বাঙালির আন্তরিকতা
এরপর আমরা গেলাম আবদুল হালিম ভাই ও ময়নুল ভাইদের রেস্টুরেন্টে। তাঁদের সঙ্গে আগে ঘনিষ্ঠ পরিচয় না থাকলেও সেখানে পৌঁছানোর পর তাঁরা আন্তরিকতার সঙ্গে আমাদের স্বাগত জানান। সারওয়ার ভাইয়ের বড় ছেলে জিসান গাড়িতে করে আমাদের রেস্টুরেন্টে নিয়ে যান।
বসার পর তাঁরা বারবার জানতে চাইলেন, আমরা কী খেতে চাই। কিছুটা সংকোচ থাকলেও তাঁদের আন্তরিক অনুরোধে আমরা খাবার গ্রহণ করি। টেবিলে ছিল নানা ধরনের বাঙালি খাবার—ডাল, মাছ, মাংস, মুরগি,নান-রুটি, লাচ্ছি, আইসক্রিমসহ নানা আয়োজন। 
খাবারের পাশাপাশি চলল প্রাণবন্ত আড্ডা। ইসলাম, প্রবাসজীবন ও বিভিন্ন সামাজিক বিষয় নিয়ে কথাবার্তা হয়। তাঁদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ, ধর্মীয় শিক্ষাসহ নানা বিষয়ে জানার আগ্রহ ছিল। সব মিলিয়ে রেস্টুরেন্টের পরিবেশটি আমাদের কাছে বেশ আপন মনে হয়।
প্রবাসে বসে বাঙালি খাবারের স্বাদ পাওয়া নিঃসন্দেহে আনন্দের; তবে তার চেয়েও বেশি ভালো লেগেছিল তাঁদের আন্তরিকতা। খাবারের প্রতিটি পদে যেমন ছিল যত্ন, তেমনি কথাবার্তা ও আচরণে ছিল আপন করে নেওয়ার উষ্ণতা। অল্প সময়ের পরিচয় হলেও তাঁদের ব্যবহার আমাদের মনে এমন এক স্বস্তি তৈরি করেছিল, যেন বহুদিনের পরিচিত মানুষের সঙ্গে বসে আছি।

ইল বার্ব দ্বীপে কিছু সময়
রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে আমরা গেলাম ইল বার্ব দ্বীপে। সোন নদীর বুকে সময়ভ্রমণ—Île Barbe
লিয়ঁ শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে সোন নদীর তীর ধরে এগোলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। ব্যস্ত নগর ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়; সামনে ভেসে ওঠে গাছপালায় ঘেরা শান্ত এক দ্বীপ—Île Barbe। নদীর জলে পুরনো পাথরের স্থাপনার ছায়া, পাতার ফাঁকে মধ্যযুগীয় গির্জার আভাস, আর স্রোতের মৃদু শব্দ—সব মিলিয়ে মনে হয়, এখানে সময় যেন একটু ধীর গতিতে চলে।
Île Barbe শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের জন্য আকর্ষণীয় নয়। এর পুরনো দেয়াল, গির্জা ও পাথুরে পথ লিয়ঁ অঞ্চলের দীর্ঘ ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। দ্বীপে হাঁটতে হাঁটতে একদিকে যেমন নদীর শান্ত সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়, অন্যদিকে তেমনি অনুভব করা যায় ইউরোপের মধ্যযুগীয় অতীতের আবহ।


মঠের সূচনা
Île Barbe-এর ধর্মীয় ইতিহাসের শুরু নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে পুরোপুরি ঐকমত্য নেই। স্থানীয় ঐতিহ্যে আরও প্রাচীন খ্রিস্টীয় সন্ন্যাসীদের উপস্থিতির কথা বলা হয়। তবে গবেষণায় সাধারণত ৫ম শতকের প্রথমার্ধে, আনুমানিক ৪৩৫ খ্রিস্টাব্দে, এখানে একটি মঠসম্প্রদায় প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ করা হয়। তাই ৪৩৫ সালকে নিশ্চিত প্রতিষ্ঠাবর্ষ নয়, বরং গবেষণামূলক অনুমান হিসেবে দেখা হয়।
দ্বীপের প্রাচীন ধর্মীয় জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ মেলে ৫১৫ সালের একটি নথিতে। সেখানে Amboise নামে এক মঠাধ্যক্ষের উল্লেখ রয়েছে। নদীর মাঝখানে অবস্থিত এই মঠ তখন প্রার্থনা, নির্জন সাধনা ও ধর্মীয় শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছিল। আজ পুরনো স্থাপনার পাশে দাঁড়ালে সহজেই কল্পনা করা যায়—শত শত বছর আগে একই নদীর ধারে সন্ন্যাসীরা নীরবে তাঁদের দিন কাটাতেন।
পরবর্তী সময়ে মঠটি Benedictine ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়। ৮ম ও ৯ম শতকে, বিশেষ করে লিয়ঁর বিশপ Leidrade-এর সময়, এর ধর্মীয় ও প্রশাসনিক গুরুত্ব বাড়ে। Charlemagne মঠটি প্রতিষ্ঠা করেননি; তবে তাঁর শাসনামলে মঠটির শিক্ষা, পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা আরও সুসংগঠিত হয়।
ধীরে ধীরে লিয়ঁ ও আশপাশের অঞ্চলে মঠটির জমি, গির্জা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। মঠটি তখন শুধু প্রার্থনার স্থান ছিল না; এটি শিক্ষা, প্রশাসন ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডেরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

আক্রমণ, ধ্বংস ও পুনর্গঠন
এই সমৃদ্ধি অবশ্য নির্বিঘ্ন ছিল না। ৭ম ও ৮ম শতকে মঠটি একাধিকবার লুটপাটের শিকার হয়। পরে ৯৩৫ থেকে ৯৪৫ সালের মধ্যে Magyar বা হাঙ্গেরীয় আক্রমণকারীদের হামলায়ও এটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নদীর মাঝখানে অবস্থান দ্বীপটিকে কিছুটা সুরক্ষা দিলেও আক্রমণকারীদের হাত থেকে পুরোপুরি রক্ষা করতে পারেনি।
ধ্বংসের পর মঠাধ্যক্ষ Eldebert পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন। ৯৭১ সালে Burgundy-এর রাজা Conrad মঠটির অধিকার ও সম্পত্তি নিশ্চিত করেন বলে মধ্যযুগীয় নথিতে উল্লেখ আছে। এর ফলে মঠটি ধীরে ধীরে আবার শক্তি ও স্থিতি ফিরে পায়।

রোমানেস্ক স্থাপত্যের স্মৃতি

Île Barbe-এর স্থাপত্যিক সমৃদ্ধির প্রধান নিদর্শন গড়ে ওঠে ১১শ ও ১২শ শতকে। আজ দ্বীপে দাঁড়িয়ে থাকা Saint-Martin গির্জার প্রধান অংশ এই সময়ের রোমানেস্ক স্থাপত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। পাথরের দেয়াল, সরল গঠন ও প্রাচীন আবহ দর্শনার্থীকে মধ্যযুগের এক ভিন্ন জগতে নিয়ে যায়।
বিভিন্ন সময়ে সংস্কার ও পরিবর্তন হলেও Saint-Martin গির্জা প্রাচীন মঠ-কমপ্লেক্সের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবশেষ। ইতিহাসে Notre-Dame-সহ আরও কিছু ধর্মীয় স্থাপনার উল্লেখও পাওয়া যায়। এসব স্থাপনার সবকিছু আজ অক্ষত নেই; তবু তাদের অবশিষ্ট অংশ দ্বীপটির অতীতের কথা মনে করিয়ে দেয়।
১২শ ও ১৩শ শতকে মঠটি সম্পদ ও প্রভাবের দিক থেকে শক্তিশালী অবস্থানে ছিল। ১১৮৩ সালে পোপ Lucius III-এর নথিতে এর সম্পত্তি ও অধিকার নিশ্চিত করার কথা জানা যায়। সে সময় Île Barbe ছিল জমি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, পাণ্ডুলিপি ও প্রশাসনিক ক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
আজ দ্বীপের নীরবতা সেই অতীতের জৌলুসের সঙ্গে তীব্র বৈপরীত্য তৈরি করে। যেখানে একসময় সন্ন্যাসী, ধর্মযাজক ও প্রশাসকদের ব্যস্ততা ছিল, সেখানে এখন শোনা যায় নদীর স্রোত, পাতার মর্মর ও পাখির ডাক।


পতনের শুরু
১৩শ শতকের পর মঠটির প্রভাব ধীরে ধীরে কমতে থাকে। সন্ন্যাসীজীবনের পরিবর্তন, সম্পত্তি পরিচালনার জটিলতা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি এর শক্তি ক্ষয় করে। বড় পরিবর্তন আসে ১৫৪৯ সালে। সে সময় Benedictine সন্ন্যাসীদের পরিবর্তে secular canons বা ধর্মযাজকদের একটি অধ্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর Île Barbe আর আগের অর্থে Benedictine মঠ হিসেবে পরিচালিত হয়নি।
দ্বীপের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়গুলোর একটি ঘটে ১৫৬২ সালে। ফরাসি ধর্মযুদ্ধের সময় Île Barbe আক্রমণের শিকার হয়। মঠের ভবন ও সম্পত্তি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গ্রন্থাগারেরও বড় ক্ষতি হয়।
পুরো গ্রন্থাগার একবারে পুড়ে ধ্বংস হয়েছিল—এমন সরল দাবি নিশ্চিত নয়। বিভিন্ন সূত্রে বরং বলা হয়, গ্রন্থসংগ্রহ ছত্রভঙ্গ, নষ্ট বা হারিয়ে যায়। আক্রমণের পর মঠটি আর আগের জৌলুস ফিরে পায়নি।
১৭৪১ সালে Île Barbe-এর ধর্মীয় অধ্যায়টি লিয়ঁর Saint-Jean ক্যাথেড্রালের অধ্যায়ের সঙ্গে একীভূত হয়। পরে ফরাসি বিপ্লবের সময় ধর্মীয় সম্পত্তি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আসে। বিশেষ করে ১৭৯৩ সালে দ্বীপের অবশিষ্ট সম্পত্তি বিক্রি করা হয়।
মঠ-কমপ্লেক্সের বহু ভবন ভেঙে যায় বা ব্যক্তিগত ব্যবহারে চলে যায়। আজ দ্বীপে হাঁটার সময় তাই দর্শনার্থী একটি সম্পূর্ণ মঠ দেখতে পান না; দেখতে পান তার বিচ্ছিন্ন অবশেষ, পুরনো পাথর ও স্থাপত্যের টুকরো টুকরো স্মৃতি।



নদী, সেতু ও নতুন পরিচয়

দ্বীপের যোগাযোগব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে ১৮২৭ সালে। সে বছর সোন নদীর ওপর একটি ঝুলন্ত সেতু নির্মিত হয়। এর ফলে Île Barbe নদীর দুই তীরের সঙ্গে আরও সহজে যুক্ত হয়।
১৯শ শতকে দ্বীপের নদী, সবুজ পরিবেশ ও মধ্যযুগীয় স্থাপত্য শিল্পী, চিত্রকর ও ভ্রমণকারীদের আকর্ষণ করতে শুরু করে। নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আলো-ছায়ার পরিবর্তন দেখা যায়; পুরনো গির্জার দিকে তাকিয়ে থাকা যায়; গাছের ছায়ায় বসে কিছুক্ষণ নীরবতাও উপভোগ করা যায়। এসব অভিজ্ঞতা দ্বীপটির ঐতিহাসিক আবহকে আরও গভীর করে তোলে।
Île Barbe-এর ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক গুরুত্ব আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায় ২ জুন ১৯৩৭ সালে। ওই দিন দ্বীপটি ফ্রান্সের সংরক্ষিত site classé হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়।
পরে ১৯৬৪ সালে Saint-Rambert-l’Île-Barbe কমিউনটি লিয়ঁ শহরের সঙ্গে একীভূত হয়। এরপর দ্বীপটি লিয়ঁর ৯ম arrondissement-এর অন্তর্ভুক্ত হয়।
আজকের Île Barbe
আজ Île Barbe-এর একাংশ ব্যক্তিমালিকানাধীন। তাই দর্শনার্থীদের নির্দিষ্ট উন্মুক্ত অংশে চলাচল করতে হয় এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির প্রতি সম্মান দেখানো জরুরি। তবু Saint-Martin গির্জা, পুরনো পাথরের স্থাপনা, নদীতীর ও সবুজ পরিবেশ দ্বীপটির দীর্ঘ অতীতের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ দেয়।
Île Barbe ভ্রমণ মানে শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখা নয়; এটি এক ধরনের ধীর অভিজ্ঞতা। নদীর স্রোত, পাখির ডাক, পুরনো দেয়ালের রুক্ষ পাথর এবং গাছের ফাঁক দিয়ে আসা আলো—সব মিলিয়ে এখানে

ইতিহাস চোখে দেখা যায়, আবার অনুভবও করা যায়

কয়েক ঘণ্টার সফরেই লিয়ঁর আধুনিক নগরজীবন থেকে মধ্যযুগের স্মৃতিময় পরিবেশে প্রবেশ করা সম্ভব। প্রাচীন মঠজীবন, মধ্যযুগীয় সমৃদ্ধি, আক্রমণ ও পুনর্গঠন, ধর্মযুদ্ধের ধ্বংস, বিপ্লব-পরবর্তী পরিবর্তন এবং আধুনিক সংরক্ষণ—সব মিলিয়ে Île Barbe লিয়ঁর ইতিহাসের এক অনন্য জীবন্ত স্মারক।
সোন নদীর বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই ছোট্ট দ্বীপ তাই একই সঙ্গে একটি ভ্রমণগন্তব্য, একটি স্থাপত্য-ঐতিহ্য এবং সময়ের ভেতর দিয়ে হাঁটার এক বিরল সুযোগ।
নদীবেষ্টিত শান্ত পরিবেশ, পুরোনো স্থাপনা ও সবুজের সমন্বয় স্থানটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। কিছু সময় সেখানে ঘোরাঘুরি ও দৃশ্য উপভোগ করার পর আমাদের স্যান্ডেলের প্রয়োজন দেখা দেয়। তাই আমরা ক্যারিফুর মার্কেটে গিয়ে স্যান্ডেল কিনে পরবর্তী গন্তব্যের দিকে রওনা হলাম।



বাংলাদেশি ঘরোয়া পরিবেশে দাওয়াত
বিকেলে আমাদের জন্য ছিল বেনজির আহমেদ ভাইয়ের বাসায় দাওয়াত। তিনি তখন বাংলাদেশে অবস্থান করছিলেন। তবে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে বারবার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেই আন্তরিক আমন্ত্রণে শেষ পর্যন্ত আমরা তাঁর বাসায় যাই।
সেখানে তাঁর দুই ছেলে তুষার, তুর্জি, তাঁর মেয়ে নাবিলা ও ফাতিমা ভাবীসহ পরিবারের সদস্যরা আমাদের স্বাগত জানান। সারওয়ার ভাইয়ের স্ত্রী হ্যাপি আপা, তাঁর বড় মেয়ে জারা এবং আইমানও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
বাসায় ঢুকেই আমরা পরিচিত বাংলাদেশি পরিবেশের উষ্ণতা অনুভব করি। বিদেশের মাটিতে থেকেও ঘরের মতো একটি পরিবেশ তৈরি করার যে আন্তরিক চেষ্টা তাঁরা করেছিলেন, তা আমাদের গভীরভাবে স্পর্শ করে। মনে হচ্ছিল, দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি পেরিয়ে আমরা যেন পরিচিত কোনো পরিবারের কাছে এসে বসেছি।
খাবারের আয়োজন ছিল বেশ সমৃদ্ধ। ইলিশ মাছ, মুরগি ও নানা ধরনের বাঙালি পদ পরিবেশন করা হয়। শেষে ছিল পায়েস ও ফলমূল। খাবারের স্বাদে যেমন ছিল ঘরের পরিচিতি, তেমনি পরিবেশনের মধ্যে ছিল


যত্ন ও ভালোবাসা

খাওয়া-দাওয়ার পাশাপাশি জমে ওঠে আড্ডা। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা, হাসি-আনন্দ এবং পারিবারিক কথাবার্তায় সময় কেটে যায়। আড্ডার একপর্যায়ে ইসলামের নানান দিক আলোচনা  হয়। প্রবাসে থেকেও সবাই মিলে এমন একটি বাংলাদেশি আবহ তৈরি করেছিলেন, যা আমাদের জন্য ছিল আনন্দের ও স্মরণীয়।
সেদিনের এই দাওয়াতকে আমরা শুধু খাবারের আয়োজন হিসেবে দেখিনি; এটি ছিল সম্পর্ক ও আন্তরিকতার এক সুন্দর প্রকাশ। প্রবাসে থাকা মানুষগুলো নিজেদের ব্যস্ততা ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও অতিথিকে সময় দেন, ঘরের খাবার রান্না করেন, গল্পে যুক্ত করেন—এই বিষয়গুলো আমাদের মনে বিশেষ অনুভূতি তৈরি করে। তাঁদের ভালোবাসা গ্রহণ করতে গিয়ে আমাদেরও মনে হচ্ছিল, এই সফরে আমরা শুধু নতুন স্থান দেখছি না; মানুষের হৃদয়ের কাছেও পৌঁছাচ্ছি।



বিদায়ের মুহূর্ত

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বিদায় নেওয়ার সময় হলো। সারওয়ার ভাই ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা আমাদের ম্যাত্তি স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে দেন। বিদায়ের সেই মুহূর্তে দিনের সব দৃশ্য যেন একে একে মনে পড়ছিল—মসজিদের শান্ত পরিবেশ, খুতবার গভীর কথা, ইল বার্বের নদীবেষ্টিত সৌন্দর্য, রেস্টুরেন্টের আন্তরিক আপ্যায়ন এবং সন্ধ্যার ঘরোয়া আড্ডা।
স্টেশনে দাঁড়িয়ে বিদায় নেওয়ার সময় মনে হলো, কয়েক ঘণ্টার এই সম্পর্কগুলোও কখনো কখনো দীর্ঘ পরিচয়ের মতো গভীর হয়ে ওঠে। তাঁদের সঙ্গে আমাদের সময় ছিল সীমিত, কিন্তু সেই সময়ের মধ্যে যে আন্তরিকতা পেয়েছি, তা ছিল নিঃস্বার্থ ও স্মরণীয়। বিদায়ের মুহূর্তে তাই আনন্দের পাশাপাশি এক ধরনের নীরব বিষণ্নতাও অনুভূত হচ্ছিল।
ভ্রমণে দেখা স্থানগুলো হয়তো একসময় স্মৃতির পাতায় ম্লান হয়ে যায়, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা সহজে মুছে যায় না। প্রবাসের মাটিতে পরিচিত-অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে যে আন্তরিকতা পেলাম, তা আমাদের এই সফরকে আরও অর্থবহ করে তুলেছে। তাঁদের সঙ্গে কাটানো কয়েক ঘণ্টা ছিল অল্প সময়ের, কিন্তু তার উষ্ণতা দীর্ঘদিন মনে থাকবে।
স্টেশন থেকে আমরা বাসে করে বাসার উদ্দেশে রওনা হলাম। রাত অনেক হয়ে গিয়েছিল। জানালার বাইরে লিওনের আলো ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছিল, আর আমাদের মনে জমা হচ্ছিল দিনের নানা স্মৃতি। শরীরে ক্লান্তি ছিল, কিন্তু মনে ছিল প্রশান্তি। মনে হচ্ছিল, আমরা শুধু একটি দিন শেষ করে ফিরছি না; বরং সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি কিছু মানুষের আন্তরিকতা, কিছু উষ্ণ মুহূর্ত এবং বিদায়ের নীরব আবেগ।
লিওন ভ্রমণের পঞ্চম দিনটি তাই আমাদের কাছে বিশেষ হয়ে থাকবে—জুমার নামাজের আধ্যাত্মিক পরিবেশ, ইল বার্বের ঐতিহাসিক আবহ, প্রবাসী বাঙালির আন্তরিক আতিথেয়তা এবং পরিচিত মানুষের ভালোবাসায় ভরা একটি দিন হিসেবে।
সামনে রয়েছে আমাদের ভ্রমণের শেষ দিন—ষষ্ঠ পর্ব। সেই পর্বের মধ্য দিয়ে শেষ হবে লিওন সফরের এই স্মৃতিময় অধ্যায়। তবে সফর শেষ হলেও এই দিনের স্মৃতিগুলো আমাদের সঙ্গে থেকে যাবে—নদীর মতোই নীরবে, কিন্তু গভীরভাবে।

আমাদের সঙ্গে থাকার জন্য পাঠকদের আন্তরিক ধন্যবাদ। 



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ