লিওঁ সফরের শেষ দিনটি ছিল আনন্দ, নতুন অভিজ্ঞতা, আন্তরিক আতিথেয়তা এবং গভীর আবেগে ভরা। দিনের শুরুতে ভাবিনি, একটি শহরকে বিদায় জানানোর পাশাপাশি কিছু মানুষও আমাদের হৃদয়ের এতটা কাছের হয়ে উঠবেন। কিন্তু দিন শেষে বুঝলাম, ভ্রমণের আসল স্মৃতি শুধু দর্শনীয় স্থান কিংবা ছবি নয়; মানুষের ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও আপন করে নেওয়ার অনুভূতিই অনেক সময় একটি সফরকে চিরস্মরণীয় করে তোলে।
শেষ সকালের প্রস্তুতি
সকালে আমরা Airbnb-এর বাসায় ছিলাম। পরিকল্পনা ছিল, বাসার মালিক এসে বাসাটি দেখে নেবেন এবং আমাদের বিদায় জানাবেন। কিন্তু একপর্যায়ে তিনি মেসেজ করে জানালেন, তাঁর আসতে কিছুটা দেরি হবে। আমাদেরও বের হওয়ার সময় হয়ে গিয়েছিল। ফলে মেসেজের মাধ্যমেই তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, তাঁর দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী বাসাটি গুছিয়ে নির্ধারিত স্থানে চাবি রেখে আমরা বেরিয়ে পড়লাম।
বাসার নিচেই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন সারোয়ার ভাই। তিনি গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমরা নিচে নামতেই তিনি আমাদের ব্যাগগুলো গাড়িতে তুলে নিলেন। এরপর মনে হলো, লিওঁ সফরের শেষ দিনটিকে সুন্দর করে তোলার দায়িত্ব যেন তিনি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন।
জ্ঞাননগরীর পথে: লিওঁর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সকাল
গাড়িতে উঠতেই সারোয়ার ভাই জানতে চাইলেন,
— “এত কিছু তো দেখলেন, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দেখেছেন?”
আমরা বললাম, সেভাবে দেখা হয়নি।

তখন তিনি লিওঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান Université Claude Bernard Lyon 1-এর কথা বললেন। মেডিকেলসহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা ও গবেষণার জন্য পরিচিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা শুনে আমাদের আগ্রহ তৈরি হলো। তাই শেষ দিনের সময়টুকু কাজে লাগিয়ে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়টি দেখতে রওনা দিলাম।
সেদিন ছিল শনিবার, তার ওপর ছুটির মৌসুম। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ ভবন, ফ্যাকাল্টি, লাইব্রেরি ও অন্যান্য স্থাপনা ভেতর থেকে দেখার সুযোগ ছিল না। তবুও বাইরে থেকে যতটা সম্ভব ঘুরে দেখলাম। বিভিন্ন ফ্যাকাল্টি, লাইব্রেরি, ক্যাফেটেরিয়া, প্রযুক্তি বিভাগের ভবনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা অংশ চোখে পড়ল।
বিশাল ক্যাম্পাস, স্থাপত্য এবং চারপাশের সবুজ পরিবেশ আমাদের বেশ ভালো লাগল। ব্যস্ত শহরের মাঝেও একটি শিক্ষাঙ্গন কীভাবে জ্ঞান, গবেষণা ও প্রকৃতির সঙ্গে সুন্দরভাবে মিশে থাকতে পারে, সেটি সেখানে দাঁড়িয়ে অনুভব করলাম।
তুর্কি নাশতার টেবিলে: ভিন্ন সংস্কৃতির স্বাদ
বিশ্ববিদ্যালয় দেখা শেষে কাছের একটি বেকারিতে আমরা সকালের নাশতা করলাম। নাশতাটি ছিল বেশ ব্যতিক্রমী—তুর্কি ধাঁচের নানা খাবারে সাজানো।
ভিন্ন সংস্কৃতির খাবারের স্বাদ নিতে নিতে মনে হচ্ছিল, ভ্রমণের সৌন্দর্য এখানেই। প্রতিটি পথ আমাদের নতুন কিছু দেখায়, নতুন কিছু শেখায় এবং নতুন কোনো সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। একটি শহরকে বোঝার জন্য তার রাস্তা ও স্থাপত্য দেখার পাশাপাশি তার খাবার ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গেও পরিচিত হওয়া দরকার।
সবুজের অন্তরালে: পার্ক, প্রাণী ও উদ্ভিদের বিস্ময়
নাশতা শেষে সারোয়ার ভাই আমাদের নিয়ে গেলেন Parc de la Tête d’Or-এর দিকে। লিওঁতে আসার কয়েক দিন আগে থেকেই পার্ক ও বোটানিক্যাল গার্ডেন দেখার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু সেদিন সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় ভালোভাবে দেখা সম্ভব হয়নি। তাই শেষ দিনে সারোয়ার ভাই নিজেই আমাদের সেগুলো দেখানোর উদ্যোগ নিলেন।
পার্কে ঢুকতেই মনে হলো, শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে আমরা যেন অন্য এক জগতে প্রবেশ করেছি। বিশাল পুরোনো গাছ, বিস্তীর্ণ সবুজ আর প্রশস্ত পথ—সব মিলিয়ে পরিবেশটি ছিল অপূর্ব। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি বহু বছর ধরে নিজের হাতে এখানে একটি বিশাল চিত্রকর্ম এঁকে রেখেছে।
এরপর আমরা পার্কের ভেতরের চিড়িয়াখানা অংশে গেলাম। নানা প্রজাতির পশুপাখি দেখলাম। বিশেষ করে জিরাফগুলো আমাদের বেশ আকর্ষণ করল। প্রাণীগুলোকে বিভিন্ন অঞ্চলভিত্তিক অংশে সাজানো হয়েছে। এশিয়ান অংশেও বেশ কিছু প্রাণী দেখার সুযোগ হলো।

চিড়িয়াখানা ঘুরে আমরা গেলাম বোটানিক্যাল গার্ডেনের দিকে। আর সেখানেই ঘটল আমাদের জন্য সবচেয়ে আনন্দের একটি আবিষ্কার।
বিভিন্ন দেশের উদ্ভিদের মধ্যে হঠাৎ চোখে পড়ল পরিচিত কিছু গাছ। ঔষধি গাছ, পেঁপে গাছসহ নানা উদ্ভিদের পাশাপাশি দেখতে পেলাম আমাদের অতি পরিচিত পানগাছ।
বিদেশের মাটিতে পানগাছ দেখে মুহূর্তেই বাংলাদেশের কথা মনে পড়ে গেল। আমাদের দেশে, বিশেষ করে এশিয়ার মানুষের কাছে পান একটি পরিচিত ও ঐতিহ্যবাহী উদ্ভিদ। দূর ইউরোপের একটি বোটানিক্যাল গার্ডেনে সেই পরিচিত গাছ দেখে মনে হলো, পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে গেলেও মানুষের শিকড় ও স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্ক কখনো পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয় না।
বোটানিক্যাল গার্ডেনের ভেতরে ছোট ছোট জলাধার ও পুকুরের মতো জায়গাও ছিল। সেখানে নানা ধরনের মাছ দেখতে পেলাম। আরও সামনে এগিয়ে কয়েকটি ছোট লেক চোখে পড়ল। লেকের পানিতে ছিল বিভিন্ন প্রজাতির বড় বড় মাছ।
প্রকৃতি, প্রাণী ও উদ্ভিদের এই অপূর্ব সমন্বয়ের মধ্যে বেশ কিছুটা সময় কেটে গেল। শেষ দিনের ব্যস্ততার মধ্যেও এই সময়টুকু আমাদের সফরকে যেন পূর্ণতা দিল।
প্রবাসের ঘরে বাংলাদেশের উষ্ণতা
পার্ক ও বোটানিক্যাল গার্ডেন ঘুরে আমরা সারোয়ার ভাইয়ের বাসার উদ্দেশে রওনা দিলাম। আগে থেকেই তাঁর বাসায় দুপুরের খাবারের দাওয়াত ছিল।
কিন্তু সেখানে পৌঁছে যে আন্তরিক অভ্যর্থনা পেলাম, তাতে মনে হলো—আমরা লিওঁতে নয়, বাংলাদেশের কোনো আপনজনের বাড়িতে এসে পৌঁছেছি।
টেবিলে একের পর এক বাংলাদেশি খাবারের আয়োজন। করলা ভাজি, শুঁটকির ভর্তা, বেগুন ভর্তা, মাছ, মাংসসহ আরও নানা পদ। বিদেশের মাটিতে বসে এমন দেশি খাবার খাওয়া ছিল আমাদের জন্য গভীর আবেগের একটি মুহূর্ত।
খাবারের স্বাদ শুধু জিভে লাগেনি, মনে গিয়ে লেগেছিল। মনে হচ্ছিল, বহু দূরে থেকেও বাংলাদেশকে যেন একবার ছুঁয়ে দেখলাম।
খাওয়া-দাওয়ার পরও সারোয়ার ভাইয়ের আন্তরিকতার যেন শেষ ছিল না। প্যারিসে ফিরে ব্যস্ততার কারণে রান্না করার সময় পাব কি না—সেটি ভেবে তিনি আমাদের জন্য দুটি প্যাকেট কাচ্চি বিরিয়ানিও দিয়ে দিলেন, সাথে দিলেন হ্যাপি আপা আমার মেয়ে নাওমীকে বিশেষ উপহার।
কয়েক ঘণ্টায় আপন হয়ে ওঠা
খাওয়া-দাওয়ার পাশাপাশি চলল দীর্ঘ আলাপচারিতা। সারোয়ার ভাইয়ের সঙ্গে গল্প হলো, তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা হলো। তাঁর বাবা ও ভগ্নিপতি ড. আহসান হাবীব ইমরোজ ভাইয়ের সঙ্গেও টেলিফোনে কথা বলার সুযোগ পেলাম। তাঁর সন্তানদের সঙ্গেও গল্প হলো। বিশেষ করে তাঁর মেয়ের সঙ্গে নানা বিষয় নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ আলোচনা করলাম।
অল্প সময়ের মধ্যেই মানুষগুলোর সঙ্গে আমাদের এক ধরনের আপন সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল।
বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশি মানুষের এমন আন্তরিকতা সত্যিই মন ছুঁয়ে গেল। মনে হলো, ভ্রমণের পথে কখনো কখনো অচেনা মানুষও খুব দ্রুত আপন হয়ে ওঠেন।
বিদায়ের ক্ষণে: প্রবাসে আপনজন পাওয়ার আনন্দ
কিন্তু সময় কাউকে অপেক্ষা করে না। আমাদের ট্রেন ধরার সময় ঘনিয়ে আসছিল। শেষ পর্যন্ত বিদায় নেওয়ার মুহূর্ত এসে গেল।
বাসা থেকে বের হওয়ার সময়টি ছিল সফরের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তগুলোর একটি। সারোয়ার ভাইয়ের ছেলেমেয়েরা আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিল। তাদের চোখেমুখে এমন এক মায়া ও কষ্ট ফুটে উঠেছিল, যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। মনে হচ্ছিল, তারা যেন চাইছে—আমরা আরও কিছুক্ষণ থাকি।
প্রবাসের জীবনে নিজের দেশ, নিজের ভাষা ও নিজের সংস্কৃতির মানুষের সান্নিধ্য পাওয়া সবসময় সহজ নয়। তাই দূরদেশ থেকে কেউ তাঁদের বাড়িতে অতিথি হয়ে এলে সেটি তাঁদের কাছে শুধু একজন অতিথির আগমন নয়; মনে হয়, নিজের দেশ ও নিজের শিকড়ের একটি অংশ যেন দূরদেশ পেরিয়ে তাঁদের ঘরে ফিরে এসেছে।
এই অনুভূতি আমাদেরও স্পর্শ করেছিল। কয়েক ঘণ্টার একটি দাওয়াত কীভাবে এত গভীর সম্পর্কের স্মৃতি হয়ে উঠতে পারে, সেদিন আমরা তা অনুভব করলাম।

সবুজের বুক চিরে: বিদায়ের পথে লিওঁর শেষ উপহার
অবশেষে আমরা সারোয়ার ভাইয়ের বাসা থেকে রেলস্টেশনের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লাম।
পথে কিছুটা এগোনোর পর যে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, সেখানে প্রতিবন্ধকতা থাকায় তাঁকে অন্য রাস্তা নিতে হলো। কিন্তু সেই বিকল্প পথটিই যেন আমাদের জন্য প্রকৃতির একটি বিশেষ উপহার হয়ে দাঁড়াল।
দুই পাশে সবুজে ঘেরা বিস্তীর্ণ এলাকা। কোথাও ক্ষেত, কোথাও গাছপালা, কোথাও ছোট ছোট পথ। সেই সবুজের বুক চিরে সরু রাস্তা এগিয়ে চলেছে।
গাড়ির জানালা দিয়ে তাকিয়ে আমরা নীরবে দৃশ্যগুলো উপভোগ করছিলাম। মনে হচ্ছিল, লিওঁ আমাদের বিদায় জানাচ্ছে তার সবচেয়ে শান্ত, সবুজ ও সুন্দর মুখটি দেখিয়ে।
স্টেশনের প্রান্তে: শেষ বিদায়, আবার দেখা হওয়ার প্রতিশ্রুতি
একসময় আমরা রেলস্টেশনে পৌঁছে গেলাম। এবার সত্যিই বিদায়ের পালা।
সারোয়ার ভাইয়ের সঙ্গে বিদায়ের মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত আবেগঘন। তিনি বললেন, আবার আসতে হবে—এবার শুধু আমরা নই, পরিবারসহ আসতে হবে। তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকেও একই আমন্ত্রণ জানানো হলো।
আমরাও বললাম, ইনশাআল্লাহ আবার দেখা হবে। তিনিও একদিন প্যারিসে আসবেন—এই পারস্পরিক দাওয়াত, ভালোবাসা ও আবার দেখা হওয়ার আশ্বাসের মধ্য দিয়ে আমরা বিদায় নিলাম।
কয়েক দিনের পরিচয় কীভাবে এতটা আপন হয়ে উঠতে পারে, সেই অনুভূতি নিয়ে আমরা স্টেশনের ভেতরে প্রবেশ করলাম।
পেছনে তাকিয়ে দেখলাম, সারোয়ার ভাই এখনো দাঁড়িয়ে আছেন। ট্রেনের দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও তাঁর মুখ, তাঁর হাত নাড়ার ভঙ্গি এবং বিদায়ের সেই মুহূর্তটি আমাদের চোখে ভাসছিল।
মনে হচ্ছিল, আমরা শুধু একটি স্টেশন ছেড়ে যাচ্ছি না; রেখে যাচ্ছি এক টুকরো ভালোবাসা, আর সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি এক পরিবারের উষ্ণতা।
ব্যাগের ঝামেলা পেরিয়ে ফেরার পথে
রেলস্টেশনে ঢুকে আরেকটি ছোট্ট ঝামেলার মুখোমুখি হতে হলো। আমাদের সঙ্গে ছিল তিনটি ব্যাগ। রেলের নিয়ম অনুযায়ী দুজন যাত্রীর জন্য নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত ব্যাগ থাকায় অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হলো। শেষ পর্যন্ত সেই আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আমরা যাত্রা শুরু করলাম।
সেদিন ট্রেনও প্রায় দশ মিনিট দেরিতে ছিল। তবে কিছুটা বিলম্ব হলেও শেষ পর্যন্ত আমরা নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছালাম। এরপর আবার অন্য পরিবহনে যেতে হলো। কোথাও কিছুটা পথ পায়ে হাঁটতে হয়েছে, কোথাও পরিবহন বন্ধ থাকায় অপেক্ষা করতে হয়েছে, আবার অন্য একটি গাড়িতে উঠতে হয়েছে।
এভাবে দীর্ঘ যাত্রার পর অবশেষে আমরা আমাদের বাসায় ফিরে পৌঁছালাম।
ক্লান্ত শরীর, ভরা হৃদয়
বাসায় পৌঁছানোর পর শরীরজুড়ে ক্লান্তি নেমে এলো। কয়েক দিনের ভ্রমণ, ঘোরাঘুরি, নানা অভিজ্ঞতা এবং বিদায়ের আবেগ—সব মিলিয়ে শরীর ও মন দুটোই পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছিল।
সবকিছু গুছিয়ে, খাওয়া-দাওয়া শেষ করে আমরা ঘুমিয়ে পড়লাম।
কিন্তু ঘুমিয়ে পড়ার আগেও মনে হচ্ছিল, দিনের প্রতিটি দৃশ্য যেন একে একে ফিরে আসছে—বিশ্ববিদ্যালয়ের নীরব প্রাঙ্গণ, তুর্কি নাশতার টেবিল, পার্কের বিশাল গাছ, বোটানিক্যাল গার্ডেনের পানগাছ, বাংলাদেশি খাবারের ঘ্রাণ, সারোয়ার ভাইয়ের পরিবারের হাসিমুখ এবং বিদায়ের সময় তাঁর সন্তানদের মায়াভরা চোখ।

সফরের সমাপ্তি, স্মৃতির অনন্ত যাত্রা
তবে আসলে কি সফর শেষ?
না! একটি শহর থেকে আমরা চলে এসেছি, কিন্তু শহরটি যে স্মৃতিগুলো দিয়ে গেল, সেগুলো তো আমাদের সঙ্গেই রয়ে গেল।
লিওঁর রাস্তা, বিশ্ববিদ্যালয়, পার্ক, বোটানিক্যাল গার্ডেন, বিদেশের মাটিতে পানগাছ দেখে বাংলাদেশের কথা মনে পড়ে যাওয়া, তুর্কি নাশতার স্বাদ, সারোয়ার ভাইয়ের পরিবারের আন্তরিকতা, বাংলাদেশি খাবারে ভরা সেই দুপুর, সন্তানদের মায়াভরা চোখ এবং সবুজের বুক চিরে স্টেশনের পথে এগিয়ে যাওয়া—সবকিছু মিলিয়ে লিওঁ আমাদের কাছে শুধু একটি শহর হয়ে থাকল না।
লিওঁ এখন আমাদের স্মৃতির ভেতর বেঁচে থাকবে—কখনো সবুজ পার্কের নীরবতায়, কখনো দূরদেশে দেখা একটি পানগাছের পরিচিত ছায়ায়, কখনো দেশি খাবারের ঘ্রাণে, আবার কখনো বিদায়ের সময় মায়াভরা কয়েকটি চোখের গভীরে।
শহর থেকে মানুষ দূরে চলে যায়, কিন্তু কিছু শহর মানুষের ভেতর থেকে কখনো দূরে সরে যায় না। লিওঁ আমাদের কাছে তেমনই এক শহর হয়ে রইল।
সারোয়ার ভাই ও তাঁর পরিবারের প্রতি রইল আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা। বিদেশের মাটিতে আপনজনের মতো যে উষ্ণতা তাঁরা দিয়েছেন, তা কোনোদিন ভোলার নয়। তাঁদের বাড়িতে আমরা শুধু অতিথি হয়ে যাইনি; বরং অল্প সময়ের জন্য হলেও তাঁদের পরিবারেরই একজন হয়ে উঠেছিলাম।
তাঁদের আন্তরিকতা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিল—দূরত্ব মানুষকে আলাদা করে না; ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও আপন করে নেওয়ার ক্ষমতাই মানুষকে কাছে আনে।
আর আপনাদের প্রতিও রইল অসংখ্য ধন্যবাদ—আমাদের এই সফরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যারা সঙ্গে ছিলেন, ভ্রমণের গল্প শুনেছেন, ছবি দেখেছেন, শুভকামনা জানিয়েছেন এবং ভালোবাসা দিয়ে পাশে থেকেছেন।
প্রতিটি সফরই আখিরাতের সফরের কথা মনে করিয়ে দেয়
এই সফরের শেষ প্রান্তে এসে আরেকটি বিষয় গভীরভাবে মনে হলো—প্রতিটি ভ্রমণই যেন আমাদের আখিরাত ও মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
আমরা যখন কোথাও ভ্রমণে যাই, তখন জানি—সেখানে আমাদের অবস্থান সাময়িক। তাই নির্দিষ্ট কয়েক দিনের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নিই। থাকার জায়গাটিও নিজেদের মতো করে সাজিয়ে নিই। কিন্তু ফিরে আসার সময় সেই ঘর, সেই স্থান এবং সেখানে থাকা অনেক কিছুই রেখে আসতে হয়। সঙ্গে নিয়ে আসি শুধু যা বহন করা সম্ভব।
দুনিয়ার জীবনও ঠিক তেমনই একটি সাময়িক সফর। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের এই দুনিয়ায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পাঠিয়েছেন। আমরা জানি না, কখন আমাদের এই সফরের সময় শেষ হয়ে যাবে এবং কখন মহান আল্লাহর ডাক চলে আসবে।
সেদিন আমাদের ঘরবাড়ি, সম্পদ, প্রিয়জন—সবকিছু রেখে চলে যেতে হবে। দুনিয়ার কোনো পার্থিব সম্পদ আমাদের সঙ্গে যাবে না। সঙ্গে থাকবে আমাদের আমল।
রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন, মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি বিষয়ের সওয়াব অব্যাহত থাকে—সদকায়ে জারিয়া, উপকারী জ্ঞান এবং এমন নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।
তাই জীবনের প্রকৃত সঞ্চয় হওয়া উচিত এমন কিছু আমল, যা মৃত্যুর পরও আমাদের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে।
ভ্রমণে বের হলে যেমন আমরা জানি, নির্দিষ্ট সময় পর ফিরে আসতে হবে, তেমনি আমাদেরও মনে রাখা দরকার—এই দুনিয়ার সফরও একদিন শেষ হবে। তবে সেই ফিরে যাওয়া হবে এমন এক জগতে, যেখানে দুনিয়ার কোনো সম্পদ আমাদের সঙ্গে যাবে না; সঙ্গে যাবে আমাদের কর্ম ও আমল।
তাই প্রতিটি সফর, প্রতিটি ভ্রমণ আমাদের জন্য আনন্দের পাশাপাশি একটি শিক্ষা হয়ে উঠুক। আমরা যেন ভ্রমণের আনন্দের মাঝেও নিজেদের প্রশ্ন করি—
“আমার আসল সফরের প্রস্তুতি কতটুকু?”
শেষ কথা
লিওঁকে আমরা বিদায় জানিয়েছি, কিন্তু লিওঁর দেওয়া ভালোবাসাকে নয়। বিদায় নিয়েছি শহরের রাস্তা, পার্ক ও স্থাপনাগুলো থেকে; কিন্তু মানুষের আন্তরিকতা, মায়া ও স্মৃতিগুলো আমাদের হৃদয়ে রয়ে গেছে।
সময়ের সঙ্গে হয়তো ছবিগুলো পুরোনো হবে, পথের বিবরণ ম্লান হয়ে যাবে; কিন্তু কিছু মুহূর্ত কখনো পুরোনো হয় না। সারোয়ার ভাইয়ের পরিবারের সেই উষ্ণতা, বিদায়ের সময়ের নীরব কষ্ট এবং আবার দেখা হওয়ার প্রতিশ্রুতি আমাদের মনে দীর্ঘদিন—হয়তো সারাজীবন—বেঁচে থাকবে।
লিওঁ আমাদের শিখিয়ে গেল—একটি সফরের শেষ মানেই সবকিছুর শেষ নয়। কখনো কখনো বিদায়ই স্মৃতিকে আরও গভীর করে, দূরত্বই সম্পর্ককে আরও মূল্যবান করে তোলে, আর অল্প সময়ের পরিচয়ও হৃদয়ে স্থায়ী একটি অধ্যায় লিখে যেতে পারে।
লিওঁকে বিদায়, কিন্তু স্মৃতিকে নয়।
আবার কোনো এক নতুন শহরে, নতুন কোনো সফরে, নতুন কোনো গল্প নিয়ে আপনাদের সঙ্গে দেখা হবে—ইনশাআল্লাহ।
ততদিন পর্যন্ত ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।
— একটি সুন্দর সফরের শেষ প্রান্ত থেকে, অনেক ভালোবাসা।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের সবাইকে দুনিয়ার এই সাময়িক সফরকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে আখিরাতের চিরস্থায়ী সফরের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।