বিএনপি ও জামায়াতের রাজনৈতিক বিরোধই মূল সমস্যা
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও নির্বাচন পদ্ধতির রাজনৈতিক দলসমুহের ঐক্যমত কতদূর
প্রধান উপেদেষ্টার সঙ্গে জাতীয় ঐক্যমত কমিশনের বৈঠক/ ফাইল ছবি
আবারও বসেছে জাতীয় ঐক্যমত কমিশন। পাচ অক্টোবর এ বৈঠক হচ্ছে। রাজনৈতিক দলসমুহের মধ্যে কতটা সমঝোতায় যাওয়া যাবে এ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রস্তাবিত জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আইনি ও নির্বাচনি পদ্ধতি নিয়ে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মৌলিক বিরোধ থাকায় আগামী নির্বাচন নিয়ে জনমনে ধোয়াশা বেড়েই চলছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিশেষজ্ঞ কমিটির সাথে সর্বশেষ বৈঠক করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সরকারকে দুই পদ্ধতিতে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ করবে এবং তা (৫ অক্টোবর) রবিবার রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে তা পেশ করবে। এরই মধ্যে আবার পি আর পদ্ধতি নিয়ে জামায়াতে ইসলামী আন্দোলনরত আছে। পিআর প্রসঙ্গে বিএনপি একেবারেই উল্টা অবস্থানে। পিআর বাংলাদেশের মানুষ বুঝেনা ফলে এমন পদ্ধতি বাংলাদেশের জন্য সঠিক নয় বলেও জানান দিচ্ছেন তারা।
শেষ মুহূর্তে ছোট রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা করে একটি সমঝোতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মঞ্চের আওতায় রাজনৈতিক দলগুলো এককভাবে এমনকি যুক্তভাবেও বড় দলগুলো বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সাথে আলোচনা করে যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানে একটি রাজনৈতিক সমঝোতায় যেতে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। গণতন্ত্রের মঞ্চ সূত্র জানায়, আলোচনা অনেকটা অগ্রগতি হয়েছে। তবে পাচ তারিখে এ নিয়ে আবারও বৈঠক অনুষ্টিত হচ্ছে।
একটি সূত্র আশা করছে ১৫ অক্টোবরের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদ নিয়ে সমঝোতায় পৌছাবে। এ বিষয়ে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ুম বলেন, কয়েক দফায় রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা হয়েছে।
সমঝোতার জন্য আমরা আলোচনা ও উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছি। আশাকরি নির্বাচনের স্বার্থে রাজনৈতিক স্মৃতিশীলতার জন্য সমঝোতা প্রয়োজন। কয়েকটি বৈঠকে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। আমরা চাচ্ছি বিএনপিও জামায়াত ইসলামীর মধ্যে একটি আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্যে আনা।
এদিকে জাতীয় ঐক্যমত কমিশন সূত্র জানায় ৫ অক্টোবরের বৈঠকের পর ১০ অক্টোবরের মধ্যে বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে সুপারিশ সরকারকে দিতে চায়। এবং ১৫ অক্টোবরের মধ্যে সব দলের স্বাক্ষরের মাধ্যমে সনদের পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে চায় কমিশন। কমিশনের দীর্ঘ বৈঠকে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে তৈরি হচ্ছে জুলাই জাতীয় সনদ।
এর খসড়া চূড়ান্ত হলেও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে এখনো ঐকমত্য হয়নি। বাস্তবায়নের উপায় ঠিক করতে ১১ সেপ্টেম্বর থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। ৫ অক্টোবর আবার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসবে কমিশন। ওই দিনই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শেষ করার চেষ্টা চলবে। সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাব বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে মোটাদাগে ছয়টি সুপারিশ পেয়েছিল কমিশন। সেগুলো হলো বিশেষজ্ঞদের সাথে আলোচনা করেও দুটি পদ্ধতির তারা সুপারিশ করতে পারে।
জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে সরকারকে দুটো প্যাকেজ প্রস্তাব সুপারিশ করবে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। প্রথম প্রস্তাবে থাকবে সংবিধান আদেশ, সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের অধীনে সুপ্রিম কোর্টের অভিমত বা উপদেশ গ্রহণ এবং গণভোট। বিকল্প প্রস্তাবে বলা হবে, একই সঙ্গে জাতীয় সংসদ ও গণপরিষদ বা সংবিধান সংস্কার সভার নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা প্রথমেই সংবিধান-সম্পর্কিত বিষয়গুলোর সমাধান করবেন।
সর্বশেষ বৈঠকে বিশেষজ্ঞ হিসেবে অংশ নেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এম এ মতিন, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন মোহাম্মদ ইকরামুল হক, বাংলাদেশ সু-প্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট ড. শরিফ ভূঁইয়া, ব্যারিস্টার তানিম হোসেইন শাওন ও ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিক।
কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেওয়া এক বিশেষজ্ঞ বলেন, একাধিক রাজনৈতিক দল যেহেতু ১০৬ অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্টের মতামত নিতে চাচ্ছে, তাকে একটি অপশন হিসেবে দেয়া যেতেই পারে। এ ক্ষেত্রে সংবিধান আদেশ ও গণভোটের সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের মতামত নেওয়ার বিষয়টি থাকবে। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকেও কমিশনকে সনদ বাস্তবায়নে একাধিক বিকল্প দিতে বলা হয়েছে। সেজন্য সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত জাতীয় সংসদই গণপরিষদ বা সংবিধান সংস্কার সভার কাজ করতে পারে কি না, সেটি চিন্তা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘সংবিধান আদেশ, গণভোট, সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের অভিমত এবং জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গেই গণপরিষদ বা সংবিধান সংস্কার সভার মাধ্যমে সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো সমাধানের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা হবে।’
যদি দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য না হয়, তাহলে ৫ অক্টোবর দলগুলোর মতামত। শোনার পর কমিশন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে বাস্তবায়নের সুপারিশ চূড়ান্ত করবে। ৮-৯ অক্টোবর বাস্তবায়নের সুপারিশ সরকারের কাছে জমা দিতে চায়। ১৫ অক্টোবর ঐকমত্য কমিশনের বর্ধিত মেয়াদ শেষ হবে। এর মধ্যেই কমিশন জুলাই জাতীয় সনদ চূড়ান্ত করতে চায়। এরপর কমিশনের মেয়াদ শেষ হলে এবিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে অর্ন্তবর্তিকালীন সরকার।
ইতিমধ্যে কিছু দল নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছেও। কিন্তু প্রধান দলগুলোর মধ্যে সে অর্থে কার্যকর আলোচনা দৃশ্যমান না হলেও যেকোন উপায়েই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ঘিরেও সমঝোতা হয়ে যেতে পারে। সে লক্ষ্যেই গনতন্ত্র মঞ্চ রাজনৈতিক সমঝোতার উদ্যাগ অনেকটাই দৃশ্যমান। বড় দলগুলোও আলোচনায় সমঝোতা চাচ্ছে।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনার জন্য যোগাযোগ করেছেন। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরের সঙ্গে তাঁরা বসার চেষ্টা করছেন।
বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে তাঁদের এই যোগাযোগ ও ‘৯ দলের উদ্যোগের’ অংশ বলে জানিয়েছেন মজিবুর রহমান। বলেন, আলোচনায় অগ্রগতি আছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে আলোচনায়। এটি হয়ে গেলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তবে এ দুই দলের মধ্যে যদি সমঝোতা না হয় তাহলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন মুশকিল হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে ফেব্রুরয়ারীতে অনুষ্টিতব্য জাতীয় নির্বাচনও অনিশ্চয়তার মধ্যে পরে যেতে পারে। কেননা সব দলেরই এক কথা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ছাড়া নির্বাচন নয়।
কমেন্ট বক্স