আমাদের ছেলেবেলার ঈদ: আশির দশকের মালিবাগের স্মৃতি

আপলোড সময় : ২০-০৩-২০২৬ , আপডেট সময় : ২০-০৩-২০২৬ ০৮:৪৬:২৬ পূর্বাহ্ন



  //মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন//



সময়ের পাতা উল্টালে আশির দশকের সেই দিনগুলো আজও যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আমরা তখন ঢাকার মালিবাগের ২১৯ নম্বর বাড়িতে থাকি। বাড়িটির নাম ছিল “ সুফি লজ “। চারপাশে এত আধুনিকতার ছোঁয়া ছিল না, ছিল না ব্যস্ততার সেই অবিরাম চাপ। কিন্তু ছিল এক অদ্ভুত উষ্ণতা, ছিল মানুষের মধ্যে আন্তরিকতা; আর ছিল ঈদকে ঘিরে সীমাহীন আনন্দের এক জগৎ। এই বাড়িতে তখন ছোট বাচ্চা বলতে আমি, তওফিক (সম্প্রতি কানাডায় মৃত্যুবরণ করেছে) পাপ্পু, লাকি , ফাহিম ( অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী) কাশফি (কানাডা প্রবাসী) , শুক্কুর, নেহারুন, দুলু, নীলু, মীরপুর বা ডিওএইচএস থেকে অনেকেই আসতো; তাদের মধ‍্যে সুজন (আমেরিকা প্রবাসী) ও আনুশে (খ‍্যাতনামা সঙ্গীত শিল্পী) সহ আরও অনেকে।



ঈদের আনন্দ শুরু হতো আসলে অনেক আগে থেকেই। নতুন জামা কেনা ছিল সেই আনন্দের কেন্দ্রবিন্দু। বাবা বা বড়দের সঙ্গে গিয়ে কাপড় পছন্দ করা, দর্জির কাছে মাপ দেওয়া; সবই ছিল উৎসবের অংশ। কিন্তু সবচেয়ে বড় মজা ছিল নতুন জামা লুকিয়ে রাখা। আলমারির এক কোণে বা ট্রাঙ্কের ভেতর যত্ন করে রাখা হতো সেটি। আমাদের কৌতূহল সামলানো কঠিন হয়ে যেত। মাঝে মাঝে চুপিচুপি বের করে দেখে আবার রেখে দিতাম, যেন কেউ টের না পায়। সেই অপেক্ষার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল ঈদের আসল আনন্দ। চাঁদ রাত ছিল এক অন্যরকম উত্তেজনার নাম। পাড়ার ছেলেরা সবাই মিলে ছাদে উঠে যেতাম চাঁদ দেখার জন্য। কেউ আগে চাঁদ দেখে ফেললে চিৎকার করে জানাতো, আর মুহূর্তেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়তো আনন্দের ঢেউ। রেডিওতে বেজে উঠতো চিরচেনা সুর জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই বিখ্যাত গান, “ রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ”।



ঘরে ঘরে তখন রান্নার ব্যস্ততা, মেয়েদের হাতে মেহেদির নকশা, আর আমাদের মনে পরদিনের ঈদ নিয়ে অগণিত স্বপ্ন। ঈদের সকাল যেন এক নতুন পৃথিবীর সূচনা। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে গোসল সেরে সেই কাঙ্ক্ষিত নতুন জামা পরার আনন্দ; তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। জামার গন্ধ, নতুনত্বের অনুভূতি; সব মিলিয়ে নিজেকে যেন অন্যরকম মনে হতো। পরিবারের সবাই একসঙ্গে ঈদের নামাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতাম। রাস্তায় বের হলেই দেখা যেত সবার মুখে হাসি, নতুন পোশাকে সজ্জিত মানুষ, এক ধরনের শান্ত অথচ উৎসবমুখর পরিবেশ। নামাজ শেষে কোলাকুলি ছিল ঈদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। ছোটরা বড়দের সালাম দিতাম, আর সেই সঙ্গে শুরু হতো ঈদ সালামি পাওয়ার প্রতীক্ষা। বড় ভাই, চাচা, মামা কিংবা পাড়ার বড়দের কাছ থেকে যে কয়টা টাকা পেতাম, তা আমাদের কাছে ছিল অমূল্য সম্পদ। সেই টাকাগুলো বারবার গুনে দেখতাম, বন্ধুদের সঙ্গে তুলনা করতাম; কে কত পেয়েছে, কে বেশি ভাগ্যবান! ঈদের দুপুরটা কাটতো আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে ঘুরে। প্রতিটি বাড়িতে আলাদা স্বাদ; সেমাই, পোলাও, কোরমা, নানা রকম মিষ্টি। কিন্তু খাওয়ার চেয়ে বেশি আনন্দ ছিল একসঙ্গে বসা, গল্প করা, হাসাহাসি।




তখন সম্পর্কগুলো ছিল অনেক বেশি কাছের, অনেক বেশি সহজ। তবে আমাদের জন্য দিনের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত সময় ছিল বিকেল। বিকেল হলেই শুরু হতো মেলায় যাওয়ার প্রস্তুতি। পাড়ার বন্ধুদের নিয়ে দল বেঁধে মেলায় যাওয়া; এ যেন এক আলাদা উৎসব। মেলায় ছিল রঙিন বেলুন, কাঠের খেলনা, বাঁশির সুর, আর নানা ধরনের মিষ্টির দোকান। নাগরদোলায় চড়া ছিল এক বিশেষ আকর্ষণ; কিছুটা ভয় লাগলেও সেই উঁচুতে ওঠার আনন্দ ছিল অসাধারণ। ঈদ সালামির টাকা তখন কাজে লাগতো। কেউ খেলনা কিনত, কেউ ফুচকা বা চটপটি খেত, কেউ আবার সব টাকা জমিয়ে রাখার চেষ্টা করত; যদিও শেষ পর্যন্ত বেশিরভাগই খরচ হয়ে যেত। বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা, ছোটখাটো তর্ক, আর আনন্দে ভরা সেই সময়গুলো আজও মনে দাগ কেটে আছে। সন্ধ্যার পর মেলার আলো আর মানুষের ভিড় এক অন্যরকম আবহ তৈরি করতো।



চারপাশে শুধু আনন্দ আর আনন্দ। বাড়ি ফিরতে মন চাইতো না, কিন্তু দিনের শেষে ক্লান্ত শরীর আর ভরা মন নিয়ে ফিরতাম। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন সেই সময়গুলোর কথা ভাবি, তখন মনে হয়; আমাদের আনন্দগুলো কত সহজ ছিল! ছিল না প্রযুক্তির ভিড়, না সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কৃত্রিমতা। ছিল শুধুই মানুষ, সম্পর্ক, আর ছোট ছোট জিনিসে খুঁজে পাওয়া বিশাল সুখ। ২১৯ মালিবাগের সেই দিনগুলো, নতুন জামা লুকিয়ে রাখার উত্তেজনা, ঈদের নামাজের পর সালামি পাওয়ার আনন্দ, আর বিকেলের মেলায় ছুটে যাওয়ার উন্মাদনা; সব মিলিয়ে আমাদের ছেলেবেলার ঈদ ছিল এক অমূল্য সম্পদ, যা সময়ের সঙ্গে মুছে যায়নি, বরং আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। এই স্মৃতিগুলোই আজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়; আসল আনন্দ কোথায় ছিল, আর আমরা কত সুন্দর এক সময়ের সাক্ষী ছিলাম।



✍🏿 লেখক

সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী প্যারিস, ফ্রান্স।
mahbubhossain786@yahoo.com

সম্পাদকীয় :

Editor and Publisher-    Muhammad Nurul Islam

Executive Editor-  Kazi Habibur Rahman.  Managing Editor -  Eng. Mohammed Nazim Uddin
Head Office: Paris, State: Île-de-France
Dhaka office : House No-421 (1st Floor), Road No- 30, New DOHS, Mohakhali, Dhaka. Bangladesh.

Email: editor.eurobarta@gmail.com.

www.eurobarta.com সকল অধিকার সংরক্ষিত 

অফিস :