// আহমেদ সোহেল বাপ্পী//
-
ইউরোপের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে এক নতুন পরিবর্তন—অভিবাসী বংশোদ্ভূত তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। লন্ডন, নিউইয়র্ক বা টরন্টোর মতো শহরে বাংলাদেশি কমিউনিটির রাজনৈতিক উপস্থিতি আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত। এবার সেই ধারায় প্যারিস ও আশপাশের এলাকাতেও বাংলাদেশি তরুণদের দৃঢ় পদচারণা নতুন আশার জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি ফ্রান্সের পৌর নির্বাচনে চারজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণ কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়া নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিফলন। দীর্ঘদিনের সংগ্রাম, প্রান্তিকতা, বৈধতার লড়াই এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির চেষ্টার ফলেই আজকের এই অবস্থান। ফাহিম মোহাম্মদ, নাহিদুল মোহাম্মদ, কৌশিক রাব্বানী খান এবং জুবায়েদ আহমেদের বিজয় দেখিয়ে দেয়—অভিবাসী পরিচয় এখন আর সীমাবদ্ধতার প্রতীক নয়, বরং সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত।কৌশিক রাব্বানী খান ইতোমধ্যেই একটি পরিচিত নাম। সামাজিক সংগঠন অফিওরার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তার কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তৃতীয়বারের মতো কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়া তার জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ। তার নেতৃত্বে দল বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছে, যা দেখায়—বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রাজনীতিকরা এখন মূলধারার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অন্যদিকে, জুবায়েদ আহমেদের বিজয় ভিন্ন এক দিক তুলে ধরে। ফরাসি ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত একজন ক্রীড়াবিদ হয়েও তিনি স্থানীয় রাজনীতিতে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। তার এই সাফল্য প্রমাণ করে, রাজনীতিতে আসার জন্য নির্দিষ্ট কোনো পেশার প্রয়োজন নেই; দরকার দৃষ্টিভঙ্গি, নেতৃত্ব এবং মানুষের আস্থা।
ফাহিম মোহাম্মদের গল্প বিশেষভাবে অনুপ্রেরণাদায়ক। মাত্র আট বছর বয়সে বাবার সঙ্গে ফ্রান্সে এসে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন। আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় একসময় তাকে অনিয়মিত অবস্থায় জীবনযাপন করতে হয়। কিন্তু তিনি থেমে থাকেননি। দাবায় সাফল্য তাকে পরিচিতি এনে দেয়, যা পরে বৈধতার পথ খুলে দেয়। পরবর্তীতে তিনি ফরাসি নাগরিকত্ব পান এবং বর্তমানে একজন ফাইনান্সিয়াল অ্যানালিস্ট হিসেবে কাজ করছেন। তার নির্বাচনী জয় এক অর্থে নতুন করে উঠে দাঁড়ানোর গল্প।
নাহিদুল মোহাম্মদ নতুন প্রজন্মের শিক্ষিত অভিবাসীদের প্রতিনিধি। প্যারিসের একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে করতেই তিনি সরাসরি মূলধারার রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন। অতি বামপন্থি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম থেকে নির্বাচিত হয়ে তিনি দেখিয়েছেন, রাজনীতি এখন আর শুধু পুরোনো প্রজন্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তার মতে, এই জয় ব্যক্তিগত নয়; এটি পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন।
এই চারজনের সাফল্যকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। এটি দীর্ঘদিনের একটি প্রক্রিয়ার ফল। ফ্রান্সে বাংলাদেশি কমিউনিটি গত কয়েক দশকে যে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি তৈরি করেছে, তার ওপর দাঁড়িয়েই এই রাজনৈতিক উত্থান সম্ভব হয়েছে। প্রথম প্রজন্ম যেখানে টিকে থাকার লড়াই করেছে, সেখানে পরবর্তী প্রজন্ম শিক্ষা ও দক্ষতার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই তরুণরা কেবল নিজেদের পরিচয়ের রাজনীতি করছেন না। তারা স্থানীয় উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার, অভিবাসী অধিকার এবং সমতার মতো বৃহত্তর ইস্যুগুলোকে সামনে আনছেন। ফলে তাদের রাজনীতি সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ভবিষ্যতমুখী।
অবশ্য পথটা সহজ ছিল না। ভাষা, সংস্কৃতি, আইনি জটিলতা এবং সামাজিক বৈষম্য—সবই ছিল বড় বাধা। তবু তারা এসব অতিক্রম করে ফরাসি সমাজের অংশ হয়ে উঠেছেন। একই সঙ্গে নিজেদের শিকড়ও ধরে রেখেছেন, আর এই দ্বৈত পরিচয়কেই শক্তিতে পরিণত করেছেন।
এই অর্জনের প্রতীকী গুরুত্বও অনেক। প্রবাসে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি তরুণদের জন্য এটি এক শক্তিশালী বার্তা—তারা চাইলে নেতৃত্ব দিতে পারে, পরিবর্তন আনতে পারে। এটি আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, স্বপ্ন দেখার সাহস জোগায়।
তবে কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়। এই প্রতিনিধিত্ব কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে? তারা কি বৃহত্তর নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারবে? নাকি স্থানীয় পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকবে? সময়ই এসব প্রশ্নের উত্তর দেবে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—এই সূচনাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য এটি গর্বের মুহূর্ত, কিন্তু একই সঙ্গে দায়িত্বেরও। এই প্রতিনিধিদের কাজ, সততা ও দক্ষতা আগামী প্রজন্মের পথ নির্ধারণ করবে। তারা সফল হলে আরও অনেক তরুণ রাজনীতিতে এগিয়ে আসবে।
সবশেষে বলা যায়, প্যারিসে বাংলাদেশি তরুণদের এই রাজনৈতিক উত্থান শুধু একটি নির্বাচনী ফল নয়; এটি একটি সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা। পরিচয়, সংগ্রাম এবং সম্ভাবনার মিলনেই তৈরি হচ্ছে নতুন ইতিহাস—আর সেই ইতিহাসের পথিকৃৎ আজকের এই চারজন কাউন্সিলর।
লেখক:
পর্যবেক্ষক ও গবেষক
গণতন্ত্র সীমান্ত হীন
প্যারিস, ফ্রান্স |
২৩ মার্চ ২০২৬