মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালী ঘিরে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-এর সামরিক পদক্ষেপের পর ইরান প্রণালীতে নৌ চলাচল সীমিত করার ঘোষণা দিলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ফ্রান্স-এর বাজারে, যেখানে দেশটি আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই রুটে যেকোনো বিঘ্নই আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত মূল্যবৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তেলের দামে বৈশ্বিক ঊর্ধ্বগতি:
সংকটের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড এর দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৬ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। একই সঙ্গে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট এর দামও ১১৫ ডলার ছাড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাই এই মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ-এর পর এই প্রথম তেলের দাম আবার ১০০ ডলারের সীমা অতিক্রম করল।
ফ্রান্সে খুচরা জ্বালানির প্রভাব:
এই বৈশ্বিক পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে ফ্রান্সের খুচরা জ্বালানি বাজারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে দেশটিতে ডিজেলের গড় মূল্য প্রতি লিটারে প্রায় ৪০ সেন্ট বেড়েছে। ৩০ মার্চ নাগাদ তা প্রায় ২.১৮ ইউরো ছাড়িয়ে যায়, যা ফেব্রুয়ারির শেষের তুলনায় প্রায় ৫০ সেন্ট বেশি।
দেশটির শীর্ষ জ্বালানি কোম্পানি টোটালএনার্জিস বাজারে স্বস্তি দিতে পেট্রোলের দাম সর্বোচ্চ ১.৯৯ ইউরো এবং ডিজেলের দাম সর্বোচ্চ ২.০৯ ইউরো নির্ধারণ করেছে। তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের ঊর্ধ্বগতির কারণে বাস্তবে অধিকাংশ এলাকায় এই সীমার চেয়েও বেশি দামে জ্বালানি বিক্রি হচ্ছে।
জনজীবন ও অর্থনীতিতে চাপ:
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ইতোমধ্যেই পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। বিশেষ করে ডিজেলনির্ভর পরিবহন ব্যবস্থার কারণে ফ্রান্সে এই প্রভাব আরও বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। অনেক এলাকায় জ্বালানি স্টেশনে চাপ এবং সীমিত সরবরাহের খবর পাওয়া গেছে, যা জনমনে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সতর্কতা:
পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল জঁ-মিশেল ফ্রেদেরিক মাক্রোঁ।
তিনি এই সংকটকে বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করে ইউরোপীয় সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
এদিকে ব্যাংক অব ফ্রান্স-এর গভর্নর ফ্রাঁসোয়া ভিলরয় দ্যা গালো সতর্ক করে বলেছেন, এই পরিস্থিতি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে শ্লথ করতে পারে এবং মুদ্রাস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
কৃষি, শিল্প ও সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব:
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে কৃষি, শিল্প ও পরিবহন খাতে ব্যয় বেড়েছে। উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অনেক জাহাজ এখন কেপ অব গুড হোপ বা আশার অন্তরীপ ঘুরে ইউরোপে যাচ্ছে, ফলে সময় ও ব্যয় উভয়ই বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালী সংকট এখন শুধু একটি ভূরাজনৈতিক ইস্যু নয়; এটি সরাসরি ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলছে। ফ্রান্সে টোটালএনার্জিস-এর মূল্য নিয়ন্ত্রণ উদ্যোগ সাময়িক স্বস্তি দিলেও, বৈশ্বিক বাজারের চাপের কারণে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে।