জ্বালানির দাম বাড়ায় ঢাকা রুটে ফ্লাইট কমাচ্ছে এয়ারলাইনগুলো

আপলোড সময় : ১৩-০৪-২০২৬ , আপডেট সময় : ১৩-০৪-২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং ভ্রমণ চাহিদার অনিশ্চয়তার কারণে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আকাশপথে চাপ বাড়ছে। বাংলাদেশ, নেপাল ও থাইল্যান্ডগামী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট সংখ্যা কমিয়ে আনছে আকাশ পরিবহন সংস্থাগুলো। বাড়তি খরচ ও যাত্রী চাহিদা ওঠানামার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বড় উড়োজাহাজ সংস্থাগুলো তাদের গ্রীষ্মকালীন সময়সূচিতেও আনছে পরিবর্তন। বিশেষ করে ইন্ডিগো ও এয়ার ইন্ডিয়ার মতো ভারতীয় এয়ারলাইনগুলো এরই মধ্যে তা শুরু করেছে। এয়ার ইন্ডিয়া ঢাকা রুটে ফ্লাইট কমিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত জ্বালানির দাম বাড়তে থাকায় এমন পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে উড়োজাহাজ পরিবহন সংস্থাগুলো। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে এভিয়েশন টারবাইন ফুয়েলের (এটিএফ) খরচ। এর প্রভাব পড়েছে উড়োজাহাজ ভাড়ায়, যা অনেক যাত্রীর নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বিশেষ করে অবকাশযাপনের পরিকল্পনা করা যাত্রীরা উচ্চ ভাড়ার কারণে ভ্রমণ স্থগিত রাখছেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রুটগুলোয় প্রত্যাশিত যাত্রী না পাওয়ায় এয়ারলাইনগুলো তাদের ফ্লাইট কমিয়ে আনছে।

এ বিষয়ে টিএএস এভিয়েশন গ্রুপের চেয়ারম্যান কেএম মোজিবুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফ্লাইট কমার পেছনে মূলত তিনটি কারণ। প্রথমত, নিরাপত্তা, যাত্রীরা একেবারে আবশ্যিক না হলে ভ্রমণ করছেন না। মধ্যপ্রাচ্য আমাদের বড় হাব। শুধু সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকেই বাংলাদেশে সপ্তাহে ১৪২টি ফ্লাইট আসে। এর মধ্যে যে যাত্রীরা যান তাদের ৬০ শতাংশই অনওয়ার্ড যাত্রী। তারা মধ্যপ্রাচ্য হয়ে যাওয়াটা এখন নিরাপদ মনে করছেন না। বিভিন্ন বিমানবন্দরে হামলার ঘটনাও এ আস্থাহীনতা বাড়িয়েছে। দ্বিতীয়ত, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি না হওয়া পর্যন্ত গালফ দেশগুলো বিদেশী ক্যারিয়ারের জন্য এয়ার স্পেস ব্লক রাখতে যাচ্ছে, স্থানীয় ক্যারিয়ারদের ক্ষেত্রে অবশ্য এ বিধিনিষেধ নেই। তৃতীয়ত, জেট ফুয়েলের মূল্যবৃদ্ধিও একটি বড় কারণ। এয়ার ইন্ডিয়া বাংলাদেশ থেকে যে যাত্রী বহন করে তার ৬০-৭০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্যগামী, যেমন ঢাকা-দিল্লি হয়ে দুবাই, কাতার বা কুয়েত। এ গন্তব্যগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা ফ্লাইট কমিয়ে দিয়েছে।’

নিয়মিত ফ্লাইট চালু হলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘ফ্লাইট কমিয়ে দেয়ায় বড় ব্যাকলগ তৈরি হবে। নিয়মিত ফ্লাইট চালু হলেও এ ব্যাকলগ কাটতে অন্তত এক বছর লাগতে পারে। ব্যবসায়িক দিক থেকেও এটি বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।’

বাংলাদেশের যাত্রীদের জন্য ভারতভিত্তিক এয়ারলাইনগুলোর ফ্লাইট সংখ্যা কমে যাওয়ায় ভোগান্তি বেড়েছে। ফলে অনেক যাত্রীকে মুম্বাই ও দিল্লির মতো ভারতীয় হাব হয়ে চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছতে হচ্ছে। এতে যাত্রার সময় যেমন বাড়ছে, তেমনি ব্যয়ও বাড়ছে উল্লেখযোগ্যভাবে। বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়াগামী যাত্রীদের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরো প্রকট হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ থেকে এ অঞ্চলে সরাসরি ফ্লাইটের সীমাবদ্ধতার কারণে যাত্রীদের সংযোগ (কানেক্টিং) ফ্লাইটের ওপর নির্ভরতা বেড়ে গেছে। এছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশে চলমান অস্থিরতার প্রভাবেও দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে উড়োজাহাজ চলাচল আরো জটিল হয়ে উঠেছে। এতে ফ্লাইট সূচিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে এবং যাত্রীদের ভ্রমণ পরিকল্পনায় ঘটছে বিঘ্ন।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। এ প্রেক্ষাপটে দেশে দুই দফায় উড়োজাহাজের জ্বালানি জেট ফুয়েলের দাম বাড়ানো হয়েছে। ফলে দেশের উড়োজাহাজ পরিবহন খাতে চাপ তৈরি হয়েছে এবং যাত্রীদের ভ্রমণ ব্যয়ও বাড়ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রথম দফায় গত ২৪ মার্চ এক লাফে প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম প্রায় ৯০ টাকা বাড়ানো হয়। পরে দ্বিতীয় ধাপে ৭ এপ্রিল লিটারপ্রতি বাড়ানো হয় আরো ২৪ টাকা ৭৯ পয়সা। ফলে মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে জেট ফুয়েলের দাম মোট ১৮২ শতাংশ বেড়ে যায়, যা সাম্প্রতিক সময়ে নজিরবিহীন।

বর্তমানে দেশে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২২৭ টাকা ৮ পয়সা। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ক্ষেত্রে প্রতি লিটার জ্বালানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৪৮০৬ ডলার।

ইউরোপেও গত সপ্তাহে জেট ফুয়েলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে প্রতি টন ১ হাজার ৮৩৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর আগে ছিল মাত্র ৮৩১ ডলার। হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক বাণিজ্য দ্রুত পুনরুদ্ধার না হলে তিন সপ্তাহের মধ্যেই ইউরোপের বিভিন্ন বিমানবন্দরে জ্বালানির ঘাটতি দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে কয়েকটি এয়ারলাইনস সতর্ক করেছে, যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে ইউরোপজুড়ে গ্রীষ্মকালীন ফ্লাইট পরিচালনা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

জ্বালানির এ আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধির কারণে এয়ারলাইনগুলোর পরিচালন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে। ফলে অনেক এয়ারলাইন সংস্থা ভাড়া বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে এবং একই সঙ্গে ব্যয় কাটছাঁট করতে কমিয়ে আনছে ফ্লাইটের সংখ্যাও। বিশেষ করে কম যাত্রী সংখ্যার রুটগুলোয় ফ্লাইট কমানোর প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জেট ফুয়েল উড়োজাহাজ পরিচালনার প্রধান ব্যয় হওয়ায় এর মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি টিকিটের মূল্যের ওপর প্রভাব ফেলে। এরই মধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ রুটে টিকিটের দাম গড়ে প্রায় ১ হাজার ও আন্তর্জাতিক রুটে ৫ হাজার টাকার বেশি পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে উড়োজাহাজ ভাড়া আরো বাড়তে পারে এবং সাধারণ যাত্রীদের জন্য ভ্রমণ ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে। পাশাপাশি ফ্লাইট সংখ্যা কমে যাওয়ায় ভ্রমণ পরিকল্পনায় বাড়তে পারে অনিশ্চয়তা।

ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সাবেক সভাপতি শিবলুল আজম কোরেশি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে উড়োজাহাজ খাতে। জ্বালানি সংকট ও ব্যয় বৃদ্ধির চাপ সামাল দিতে ভারতের এয়ারলাইনসসহ বিশ্বের অনেক উড়োজাহাজ সংস্থা বাংলাদেশগামী ফ্লাইটের সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রী পরিবহন সংকুচিত হচ্ছে এবং ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় ভ্রমণ চাহিদাও কমে আসছে।’

এতে পর্যটন খাতের পাশাপাশি ট্রাভেল এজেন্সি, ট্যুর অপারেটর ও সংশ্লিষ্ট সেবা খাতগুলোও চাপের মুখে পড়েছে বলে জানান পর্যটন খাতের এ ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের পর্যটন ও এভিয়েশন খাতে নেতিবাচক প্রভাব আরো গভীর হতে পারে। সেই সঙ্গে খাতটির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।’

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় রুটেই পড়েছে। উড়োজাহাজ সংস্থাগুলো জ্বালানি সারচার্জ আরোপ করতে বাধ্য হচ্ছে, যা টিকিটের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। পরিবহনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, যখন জ্বালানির দাম ছিল প্রতি ব্যারেল ৮০ ডলারের কাছাকাছি, তখন প্রায় অর্ধেক আসন কম দামে বিক্রি হতো। আন্তর্জাতিক ও চার্টার ফ্লাইটে এভিয়েশন টারবাইন ফুয়েলের দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে, যদিও রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিগুলো এপ্রিলে নির্ধারিত অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে মূল্যবৃদ্ধি ২৫ শতাংশে সীমিত রেখেছে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংসের বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, জেট ফুয়েলের ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধির কারণে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের উড়োজাহাজ সংস্থাগুলোর মুনাফা আরো সংকুচিত হবে।

মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কেবল আন্তর্জাতিক নয়, অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটেও পড়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ঢাকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে একের পর এক ফ্লাইট বাতিল অব্যাহত রয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের সাতটি দেশ—ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়ায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিভিন্ন এয়ারলাইনসের ফ্লাইট বাতিলের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় মাসে মোট ১ হাজার ৬০টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, সংকটের শুরুতে অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৯ মার্চ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৩৩৯টি ফ্লাইট বাতিল হয়। পরের ধাপে ১০ থেকে ১৯ মার্চ পর্যন্ত ২৭৫টি এবং ২০ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত ২২৬টি ফ্লাইট তাদের যাত্রা বাতিল করতে বাধ্য হয়। সংকটের তীব্রতা কিছুটা কমলেও ৩০ মার্চ থেকে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত ১৬০টি এবং সর্বশেষ ৯ থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত ৬০টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যগামী যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েছেন। অনেক এয়ারলাইনস বিকল্প রুটে ফ্লাইট পরিচালনার চেষ্টা করলেও অতিরিক্ত সময় ও জ্বালানি খরচের কারণে বিপুলসংখ্যক শিডিউল স্থগিত রেখেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী দিনগুলোয়ও পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির সম্ভাবনা কম। বরং ফ্লাইট সংখ্যা সীমিত এবং ভাড়া বেশি থাকার প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে ভ্রমণ করতে যাওয়া যাত্রীদের সম্ভাব্য বিঘ্ন ও দীর্ঘ ভ্রমণ সময়ের কথা মাথায় রেখে পরিকল্পনা করার পরামর্শ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। সূত্র: বনিক বার্তা 

সম্পাদকীয় :

Editor and Publisher-    Muhammad Nurul Islam

Executive Editor-  Kazi Habibur Rahman.  Managing Editor -  Eng. Mohammed Nazim Uddin
Head Office: Paris, State: Île-de-France
Dhaka office : House No-421 (1st Floor), Road No- 30, New DOHS, Mohakhali, Dhaka. Bangladesh.

Email: editor.eurobarta@gmail.com.

www.eurobarta.com সকল অধিকার সংরক্ষিত 

অফিস :