নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১৩ বছর পর সিরিজ জিতলো বাংলাদেশ। নাজমুল হোসেন শান্ত’র সেঞ্চুরী সহ দুর্দান্ত ইনিংস ও লিটন দাসের দারুণ ব্যাটিংয়ের ভিত্তিতে গড়া রান, পরে মোস্তাফিজুর রহমানের নেয়া পাঁচ উইকেট। সবমিলিয়ে
জয় আসে ৫৫ রানে। এই জয়ে ২-১ ব্যবধানে ওয়ানডে সিরিজ জিতে নিল বাংলাদেশ।
এর আগে ২০১৩ সালের নভেম্বরে একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে সিরিজ জিতেছিল বাংলাদেশ।
চট্টগ্রামে তৃতীয় ওয়ানডেতে অনেকটাই দর্শক খড়া স্টেডিয়ামে প্রথম ব্যাটিং করে বাংলাদেশ সংগ্রহ করেছিল ২৬৫ রান। বাংলাদেশের দেওয়া ২৬৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই ধাক্কা খায় নিউজিল্যান্ড। সেই ধাক্কা শেষ পর্যন্ত সামলাতে পারেনি তারা। বাংলাদেশের এই রানই তাদের কাছে পাহাড়সম হয়ে যায়। মোস্তাফিজুর রহমানের বোলিং তোপে ২১০ রানেই গুটিয়ে যায় কিউইরা।
ইনজুরি কাটিয়ে দলে ফেরা মোস্তাফিজই এনে দেন প্রথম সাফল্য। ইনিংসের চতুর্থ ওভারে তার বাউন্সারে বিভ্রান্ত হয়ে হেনরি নিকোলস ক্যাচ তুলে দেন লিটন দাসের হাতে। ১০ বলে ৪ রান করে ফেরেন তিনি।
এরপর কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন নিক কেলি ও উইল ইয়াং। তবে ১০ম ওভারে এলবিডব্লিউর জোরালো আবেদন থেকে বেঁচে যান কেলি। ১৪তম ওভারে আক্রমণে এসে ব্রেকথ্রু দেন নাহিদ রানা। তার গতির ডেলিভারিতে ফাঁদে পড়েন ইয়াং। ২৫ বলে ১৯ রান করা এই ব্যাটারের বিদায়ে ভাঙে ৪৬ রানের জুটি।
এরপর টম ল্যাথামকে নিয়ে ইনিংস এগোনোর চেষ্টা করেন কেলি। কিন্তু বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক। ১৭তম ওভারে মেহেদী হাসান মিরাজের বল ব্যাটের কানায় তুলে দেন ক্যাচ, সহজেই তা লুফে নেন শরিফুল ইসলাম। ১৩ বলে ৫ রান করে ফেরেন ল্যাথাম।
মাঝের ওভারগুলোতে প্রতিরোধ গড়লেও নিয়মিত উইকেট হারিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে পড়ে সফরকারীরা। ল্যাথামের বিদায়ের পর ইনিংস মেরামতের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন কেলি। ৬৮ বলে অর্ধশতক পূর্ণ করে দলকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।
তবে ২৬তম ওভারে ভাঙে এই জুটি। মেহেদী হাসান মিরাজের কৌশলী পরিবর্তনে আক্রমণে এসে সাফল্য পান মোস্তাফিজ। তার দুর্দান্ত ডেলিভারি বুঝতে না পেরে ক্যাচ দেন কেলি, ৮০ বলে ৫৯ রান করে ফেরেন তিনি।এরপর শরিফুল ইসলামের বলে আউট হন আব্বাস। লেগ সাইডে খেলতে গিয়ে বল স্টাম্পে টেনে আনেন এই ব্যাটার, ৩৬ বলে করেন ২৫ রান করেন তিনি।
৩৩তম ওভারে গতি দিয়ে আঘাত হানেন নাহিদ রানা। দারুণ এক ইয়র্কারে বোল্ড করেন জশ ক্লার্কসনকে, যিনি ১০ বলে ৬ রান করেন। এরপর ম্যাচ পুরোপুরি বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ৩৬তম ওভারে মোস্তাফিজের বলে ক্যাচ দেন নাথান স্মিথ, অসাধারণ ক্যাচ নেন মেহেদী হাসান মিরাজ।
৩৮তম ওভারে আবার আঘাত হানেন মোস্তাফিজ। এবার তার জালে ধরা পড়েন জেডেন লেনক্স, দারুণ ক্যাচ নেন তাওহীদ হৃদয়। শেষ পর্যন্ত ৪০তম ওভারে নিজের পঞ্চম উইকেট তুলে নেন মোস্তাফিজ। উইল ও’রুর্ককে বোল্ড করে ওয়ানডেতে ষষ্ঠবারের মতো পাঁচ উইকেট পূর্ণ করেন এই বাঁহাতি পেসার। ৫ বলে ১ রান করেন ও’রুর্ক। তার সঙ্গে ক্রিজে ছিলেন ডিন ফক্সক্রফট। মোস্তাফিজের পাঁচ উইকেটের দাপটে জয়ের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যায় বাংলাদেশ।
তবে শেষ থেকে বাংলাদেশের গলার কাঁটা হয়ে ওঠেন ফক্সক্রপট। তার ব্যাটিং তোপে হারের শঙ্কাতেই পড়ে যায় বাংলাদেশ। তবে সেই ঝড় থামাতে দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন অধিনায়ক নিজেই। মিরাজের বলে সাইফ হাসানের ক্যাচে ৭২ বলে ৭৫ রানের ঝড় থামে, যেখানে ছিল ৭টি ছক্কা। থেমে যায় কিউইদের ইনিংসও।
এর আগে টস হেরে ইনিংসের শুরুতেই ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। প্রথম ওভারেই উইকেট হারান সাইফ হাসান। উইল ও’রুর্ক অফ স্টাম্পের বাইরের বল ঠিকভাবে খেলতে পারেননি তিনি, ব্যাটের কানায় লেগে বল চলে যায় উইকেটরক্ষক টম ল্যাথামের গ্লাভসে। কোনো রান না করেই ফিরতে হয় এই ওপেনারকে।
দ্বিতীয় ওভারে একবার সুযোগ তৈরি করেও সফল হতে পারেনি নিউজিল্যান্ড। ন্যাথান স্মিথের বল প্যাডে লাগার পর জোরালো আবেদন করা হলেও আম্পায়ার সাড়া দেননি।
তৃতীয় ওভারে আবার আঘাত হানেন ও’রুর্ক। অফ স্টাম্পের বাইরের বল খেলতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারান তানজিদ হাসান। ৫ বলে ১ রান করে ফিরে যান তিনি।
এরপর কিছুটা প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন সৌম্য সরকার ও শান্ত। সৌম্য কয়েকটি দৃষ্টিনন্দন শট খেললেও পুরোপুরি স্বচ্ছন্দ ছিলেন না। ৩৮ বলের ছোট্ট জুটিতে আসে ২৩ রান। তবে আবারও ও’রুর্ক আঘাতে ভাঙে এই জুটি। অফ স্টাম্পের বাইরের বল ব্যাটের কানায় লেগে বল গিয়ে লাগে স্টাম্পে। ২৬ বলে ১৮ রান করেন সৌম্য। ফলে ১০ ওভারর আগেই বাংলাদেশকে খোঁয়াতে হয় টপ অর্ডারকে।
শুরুর ধাক্কা কাটিয়ে চট্টগ্রামে ইনিংস গড়ার পথে ভরসার জুটি গড়েন শান্ত ও লিটন। চতুর্থ উইকেটে ধীরে শুরু করলেও সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে রানের গতি বাড়ান এই দুই ব্যাটার।ইনিংসের ২৬তম ওভারে শান্ত পৌঁছে যান ব্যক্তিগত অর্ধশতকে, ৭০ বলে ফিফটি করেন তিনি। পরপর দুই ম্যাচেই ফিফটির দেখা পান এই অধিনায়ক। অন্যদিকে লিটন শুরুতে বেশ সংযত ছিলেন, ঝুঁকি না নিয়ে উইকেটে টিকে থাকার দিকেই মনোযোগ দেন।
২৯তম ওভারে এসে লিটনের ব্যাট থেকে আসে প্রথম বাউন্ডারি, সেটিও ৬০ বল খেলার পর। জেডেন লেনক্সকে চার মেরে স্বস্তি পান এই ডানহাতি ব্যাটার। পরের ওভারে বেন লিস্টারের বিপক্ষে আরেকটি চার মেরে জুটির রান তিন অঙ্কে নিয়ে যান তিনি। লিটনও তুলে নেন ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ১৩তম ফিফটি, যদিও শুরুটা ছিল ধীরগতির। প্রথম ৫৯ বলে তিনি শুধু সিঙ্গেল-ডাবলেই সীমাবদ্ধ ছিলেন।
৩৯তম ওভারে ভাঙে গুরুত্বপূর্ণ চতুর্থ উইকেট জুটি। লেনক্সের বলে স্টাম্প ছেড়ে খেলতে গিয়ে বোল্ড হন লিটন দাস। ১৭৮ বলের জুটিতে আসে ১৬০ রান। ৯১ বলে ৭৬ রান করে ফেরেন এই উইকেটরক্ষক ব্যাটার। এরপর ইনিংসের হাল ধরেন শান্ত। ৪১তম ওভারে সিঙ্গেল নিয়ে তুলে নেন নিজের সেঞ্চুরি, ১১৪ বলে তিন অঙ্ক ছোঁন তিনি। এটি তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারের চতুর্থ শতক। তবে বড় ইনিংস খেলেও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি শান্ত। ৪৩তম ওভারে লেনক্সের বল উড়িয়ে মারতে গিয়ে আউট হন তিনি।
শেষদিকে দ্রুত রান তুলতে নেমে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করেন মেহেদী হাসান মিরাজ। তাওহীদ হৃদয়কে নিয়ে ২০ বলে ৩৫ রানের জুটি গড়েন তিনি। কিন্তু ৪৮তম ওভারে ডিন ফক্সক্রফটের বলে বড় শট খেলতে গিয়ে ক্যাচ দেন মিরাজ। ১৮ বলে ২২ রান করে ফেরেন তিনি। এরপর শেষ ওভারে জোড়া আঘাত হানেন বেন লিস্টার। প্রথমে শরিফুল ইসলামকে কিপারের ক্যাচে ফেরান, রিভিউ নিয়ে আউট নিশ্চিত করে নিউজিল্যান্ড। পরের বলেই তানভির ইসলাম বড় শট খেলতে গিয়ে আউট হন। হৃদয় ২৯ বলে ৩৩ রানে অপরাজিত থাকেন, বাংলাদেশ থামে আট উইকেট হারিয়ে ২৬৫ রানে।