//মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন//
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি আজ এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বহুদিন ধরে চলে আসা পারস্পরিক অবিশ্বাস, অভিযোগ-প্রতিযোগিতা এবং প্রতিপক্ষকে হেয় প্রতিপন্ন করার প্রবণতা এখন যেন রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থান সেই পুরোনো সংকটকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। এই দ্বন্দ্ব কেবল দুই দলের অভ্যন্তরীণ বা কৌশলগত সমস্যা নয়; এটি দেশের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক চর্চা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে।
রাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা, রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিগত দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করা এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, নীতি ও আদর্শের প্রশ্নগুলো ক্রমশ আড়ালে চলে যাচ্ছে, আর সামনে চলে আসছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক আক্রমণ, অতীতের অভিযোগ, এবং প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা। বিএনপি ও জামায়াতের সাম্প্রতিক বিরোধ এই বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্ট করেছে। একে অপরকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার প্রচেষ্টায় তারা এমন ভাষা ও কৌশল ব্যবহার করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের জন্যই ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।
এই ধরনের নেতিবাচক বয়ান শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পর্ককেই বিষাক্ত করে না; এটি সাধারণ মানুষের মনোজগতে বিভ্রান্তি, হতাশা এবং অনাস্থা সৃষ্টি করে। যখন মানুষ দেখে যে রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে ক্রমাগত অভিযোগ করে যাচ্ছে কিন্তু বাস্তব সমস্যার সমাধানে কার্যকর কোনো প্রস্তাব দিচ্ছে না, তখন তারা রাজনীতির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এর ফলে গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, কারণ গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি হচ্ছে সচেতন ও অংশগ্রহণমূলক নাগরিক সমাজ।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এই ধরনের সংঘাত অনিচ্ছাকৃতভাবে কর্তৃত্ববাদী বা ‘পতিত ফ্যাসিবাদী’ প্রবণতাকে পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ তৈরি করে। ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, যখন সমমনা শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে, তখন পতিত স্বৈরাচারী শক্তি সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করে এবং ফিরে আসার পথ খোঁজে। বিভাজিত সমমনা রাজনীতি কখনোই গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে পারে না; বরং এটি রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করে এবং পতিত ফ্যীসিবাদের ফিরে আসার পথ প্রশস্ত করে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন একটি মৌলিক পরিবর্তন—রাজনৈতিক বয়ানে ইতিবাচকতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা। প্রথমত, রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নিজেদের অবস্থান পরিষ্কারভাবে নীতি ও কর্মসূচির ভিত্তিতে উপস্থাপন করা। তারা কী করতে চায়, কীভাবে দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা সুশাসনের উন্নয়ন ঘটাবে—এই বিষয়গুলো নিয়ে স্পষ্ট ও গঠনমূলক আলোচনা প্রয়োজন। প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করা নয়, বরং জনগণকে একটি বিকল্প পথ দেখানোই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
দ্বিতীয়ত, সংলাপের সংস্কৃতি পুনরুজ্জীবিত করা জরুরি। মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু সেই মতপার্থক্যকে শত্রুতায় রূপান্তর করা গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রেখে আলোচনা-সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজা একটি পরিণত রাজনৈতিক সংস্কৃতির লক্ষণ।
তৃতীয়ত, গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা যদি দায়িত্বশীলভাবে তথ্য উপস্থাপন করে এবং নেতিবাচক ও উসকানিমূলক বক্তব্যকে গুরুত্ব না দিয়ে গঠনমূলক আলোচনাকে সামনে নিয়ে আসে, তাহলে রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের ভাষা ও আচরণে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হবে। একইভাবে নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর ইতিবাচক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সবশেষে, এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। নেতিবাচক বয়ান থেকে বেরিয়ে এসে একটি সহনশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং নীতিনির্ভর রাজনীতি গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। বিএনপি ও জামায়াতসহ দেশের সব রাজনৈতিক শক্তিরই উচিত উপলব্ধি করা যে, পারস্পরিক সংঘাতের মাধ্যমে নয়, বরং সহযোগিতা, সংলাপ এবং ইতিবাচক প্রতিযোগিতার মাধ্যমেই একটি শক্তিশালী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই উপলব্ধির উপর—রাজনীতি যদি বিভাজনের হাতিয়ার না হয়ে ঐক্যের সেতুবন্ধন হয়ে উঠতে পারে, তবেই গণতন্ত্র তার প্রকৃত শক্তি ফিরে পাবে।
লেখক:
ফ্রান্স থেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।
mahbubhossain786@yahoo.com