পহেলা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস

শ্রমের মর্যাদা, অধিকার ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের অঙ্গীকার

আপলোড সময় : ২৯-০৪-২০২৬ , আপডেট সময় : ২৯-০৪-২০২৬


//মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন// 


প্রতি বছর পহেলা মে বিশ্বব্যাপী পালিত আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস বা মে দিবস মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক অনন্য তাৎপর্য বহন করে। এটি এমন একটি দিন, যা শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং ঐক্যের প্রতীক হিসেবে স্বীকৃত। এই দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক উদযাপন নয়; বরং এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থনীতির প্রতিটি স্তম্ভ গড়ে ওঠে শ্রমিকদের নিরলস পরিশ্রমের ওপর ভিত্তি করে।

শিল্পবিপ্লবের পরবর্তী সময়ে ইউরোপ ও আমেরিকায় শিল্পায়নের প্রসার ঘটলে শ্রমিকদের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। কিন্তু সেই সঙ্গে তাদের ওপর শোষণও বেড়ে যায় বহুগুণে। শ্রমিকদের দৈনিক ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে বাধ্য করা হতো, মজুরি ছিল অপ্রতুল, এবং কর্মপরিবেশ ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। শ্রমিকদের জন্য কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ছুটি বা স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা ছিল না। শিশু ও নারী শ্রমিকদেরও কঠোর পরিশ্রমে নিয়োজিত করা হতো, যা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত।

এই অমানবিক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে শ্রমিকরা ধীরে ধীরে সংগঠিত হতে শুরু করেন। তাদের প্রধান দাবি ছিল ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস নিশ্চিত করা, যাতে তারা কাজের পাশাপাশি পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনের জন্য সময় পায়। ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে শ্রমিকরা এই দাবিতে ব্যাপক ধর্মঘটের সূচনা করেন। কয়েকদিনব্যাপী এই আন্দোলনের এক পর্যায়ে ৪ মে হে মার্কেট স্কয়ারে এক সমাবেশে বোমা বিস্ফোরণ ও পুলিশের গুলিতে বহু শ্রমিক নিহত ও আহত হন। ইতিহাসে এই ঘটনাটি ‘হে মার্কেট ট্র্যাজেডি’ নামে পরিচিত। যদিও এই ঘটনা ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক, তবুও এটি বিশ্বব্যাপী শ্রমিক আন্দোলনকে শক্তিশালী করে তোলে এবং শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে নতুন গতি দেয়।

পরবর্তীতে ১৮৮৯ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক সম্মেলনে ১ মে-কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই দিনটি পালিত হয়ে আসছে শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে। ধীরে ধীরে এই আন্দোলনের ফলে শ্রমিকদের জন্য বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়, যেমন ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস, ন্যায্য মজুরি, সাপ্তাহিক ছুটি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বা “আইএলও” গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থাটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শ্রমমান নির্ধারণ করে এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। শ্রমিকদের জন্য মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এই সংস্থার মূল লক্ষ্য।

বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শ্রমিকদের অবদান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প দেশের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। তবে এই খাতে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে এখনও নানা সমস্যা বিদ্যমান। ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধস-এর মতো মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা কতটা জরুরি। এই ঘটনার পর কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও এখনও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর তদারকি ও বাস্তবায়নের ঘাটতি রয়েছে।
এখানে উল্লেখ‍্য, এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় শিল্প দুর্ঘটনা, যেখানে বহু শ্রমিক নিহত ও আহত হন।

বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে শ্রমবাজারে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কাজের প্রসার নতুন সুযোগ তৈরি করলেও শ্রমিকদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি করেছে। গিগ ইকোনমির আওতায় কাজ করা অনেক শ্রমিক নিয়মিত চাকরির সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকেন, যেমন পেনশন, স্বাস্থ্য বীমা বা চাকরির নিরাপত্তা। ফলে শ্রম আইন ও নীতিমালাকে সময়োপযোগী করে তোলা এখন অত্যন্ত জরুরি।

নারী শ্রমিকদের অবস্থাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তারা এখনও সমান কাজের জন্য সমান মজুরি থেকে বঞ্চিত হন এবং কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের শিকার হন। একইভাবে অভিবাসী শ্রমিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আইনি সুরক্ষা সীমিত। এই প্রেক্ষাপটে শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস আমাদের সামনে এক গভীর বার্তা তুলে ধরে—শ্রমিকদের অধিকার কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়, বরং এটি তাদের মৌলিক মানবাধিকার। এই দিবসের চেতনাকে বাস্তবায়ন করতে হলে সরকার, মালিকপক্ষ এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায্য মজুরি প্রদান, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, শ্রম আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা এবং শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা এখন সময়ের অন্যতম প্রধান দাবি।

সবশেষে বলা যায়, পহেলা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস কেবল অতীতের সংগ্রামের স্মৃতি বহন করে না; এটি বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য একটি প্রেরণার উৎস। শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার এই সংগ্রাম চলমান, এবং তা অব্যাহত রাখতে হলে আমাদের সবাইকে সচেতন, দায়িত্বশীল এবং মানবিক হতে হবে। একটি ন্যায়ভিত্তিক, সমতাভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলার জন্য মে দিবসের চেতনা আমাদের প্রতিনিয়ত পথ দেখিয়ে যাবে।

লেখক: 
ফ্রান্স থেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।
mahbubhossain786@yahoo.com  

সম্পাদকীয় :

Editor and Publisher-    Muhammad Nurul Islam

Executive Editor-  Kazi Habibur Rahman.  Managing Editor -  Eng. Mohammed Nazim Uddin
Head Office: Paris, State: Île-de-France
Dhaka office : House No-421 (1st Floor), Road No- 30, New DOHS, Mohakhali, Dhaka. Bangladesh.

Email: editor.eurobarta@gmail.com.

www.eurobarta.com সকল অধিকার সংরক্ষিত 

অফিস :