রক্তে লেখা মে দিবস, অধিকারহীন আজও শ্রমিক ঘামের মজুরি, রক্তের দাম

শ্রমিকের অধিকার আজও অধরা

আপলোড সময় : ২৯-০৪-২০২৬ , আপডেট সময় : ২৯-০৪-২০২৬

//আহমেদ সোহেল বাপ্পি// 


মে দিবসের দেড়শত বছরের দ্বারপ্রান্তেও বিশ্বের কোটি কোটি শ্রমিক ন্যায্য মজুরি ও মানবিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত। বাংলাদেশে এই বঞ্চনার চিত্র আরও গভীর। ১৮৮৬ সালের ৩ মে। আমেরিকার শিকাগো শহরের হেমার্কেট স্কোয়ারে সেদিন এক অভূতপূর্ব জনস্রোত। আট ঘণ্টা কাজের ন্যায্য দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন হাজার হাজার ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত শ্রমিক। তাঁদের কণ্ঠে স্লোগান — "আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম, আট ঘণ্টা নিজেদের জন্য।" কিন্তু সেই শান্তিপূর্ণ মিছিলের মাঝে হঠাৎ একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়, শুরু হয় পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষণ। মুহূর্তের মধ্যে রাজপথ রঞ্জিত হয় শ্রমিকের রক্তে। পরবর্তী দিনগুলোতে অগাস্ট স্পাইজ, আলবার্ট পার্সনসহ বেশ কয়েকজন শ্রমিক নেতাকে বিচারের নামে ফাঁসিকাঠে ঝোলানো হয়।

সেই রক্তাক্ত স্মৃতিকে ধারণ করেই ১৮৮৯ সালে প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক কংগ্রেসে ১ মে-কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশে এই দিনটি সরকারি ছুটি ও শ্রমিক অধিকারের প্রতীক হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এই দিনটি কোনো উৎসবের উপলক্ষ নয় — এটি লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের ত্যাগ ও সংগ্রামের শপথের দিন। শ্রমিকের ন্যায্য পারিশ্রমিকের প্রশ্নে ইসলাম ধর্ম অত্যন্ত স্পষ্ট ও মানবিক অবস্থান গ্রহণ করেছে। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এ বিষয়ে এক অনন্য নির্দেশনা দিয়েছেন —


"তোমরা শ্রমিকের ঘাম শুকিয়ে যাওয়ার আগেই তার পারিশ্রমিক পরিশোধ করো।"— সুনানে ইবনে মাজাহ ও বায়হাকি শরিফ


ইসলামি শরিয়তে শ্রমিকের মজুরি আটকে রাখাকে সুস্পষ্টভাবে জুলুম ও হারাম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনের সূরা আত-তাওবার ১০৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, "তোমরা কাজ করো, আল্লাহ তোমাদের কাজ দেখবেন।" ইসলামের এই মহান শিক্ষা আজকের বৈশ্বিক শ্রম আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করে এবং প্রমাণ করে যে শ্রমিকের অধিকার রক্ষা করা শুধু রাজনৈতিক বিষয় নয়, এটি গভীরভাবে নৈতিক ও ধর্মীয় দায়বদ্ধতার বিষয়ও।
বিশ্বের বর্তমান শ্রম পরিস্থিতি একটি গভীর উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সমগ্র বিশ্বে প্রায় ৩৩০ কোটি কর্মজীবী মানুষ রয়েছেন। এঁদের মধ্যে মাত্র ৩৫ শতাংশ আন্তর্জাতিক শ্রম মানদণ্ড অনুযায়ী মজুরি ও সুযোগ-সুবিধা পান। বাকি ৬৫ শতাংশ — প্রায় ২১৫ কোটি মানুষ — অনানুষ্ঠানিক বা শোষণমূলক পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হন। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে এখনো ১৬ কোটিরও বেশি শিশু শ্রম পরিস্থিতিতে জীবন কাটাচ্ছে। উন্নত দেশে একজন শ্রমিক যেখানে ঘণ্টায় ২০ থেকে ৩০ মার্কিন ডলার মজুরি পান, সেখানে দক্ষিণ এশিয়ায় একজন শ্রমিকের ঘণ্টাপ্রতি আয় মাত্র ০.৫০ থেকে ১ ডলার। এই ভয়াবহ বৈষম্য একটি জটিল বৈশ্বিক সংকটের প্রতিফলন।


বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শ্রমিকদের অবস্থা বিশ্লেষণ করলে একটি জটিল ও বহুমাত্রিক চিত্র উঠে আসে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৭ কোটি ৩০ লক্ষ কর্মজীবী মানুষ রয়েছেন। এদের ৮৫ শতাংশেরও বেশি অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত এবং মাত্র ১৫ শতাংশ কোনো আনুষ্ঠানিক সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা উপভোগ করেন। মহিলা শ্রমিকরা একই কাজের জন্য পুরুষের তুলনায় গড়ে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কম মজুরি পান। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ধসে ১,১৩৪ জন শ্রমিক প্রাণ হারান — এই ট্র্যাজেডি বিশ্বের সামনে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অরক্ষিত অবস্থান নগ্নভাবে তুলে ধরেছিল।


বাংলাদেশে পোশাক শিল্প দেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ যোগান দেয় এবং এই শিল্পে ৪২ লক্ষেরও বেশি শ্রমিক কর্মরত, যাদের ৮০ শতাংশেরও বেশি নারী। তবু এই বিশাল অবদানের বিপরীতে মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক দীর্ঘকাল ধরে একটি কাঠামোগত অসমতার উপর দাঁড়িয়ে আছে। শ্রম আইন থাকলেও তার প্রয়োগ দুর্বল। গার্মেন্টস কারখানার মাত্র ১০ শতাংশে কার্যকর ট্রেড ইউনিয়ন রয়েছে। শ্রম বিশেষজ্ঞ তাসলিমা আক্তারের মতে, "বাংলাদেশে একজন পোশাক শ্রমিকের মাসিক মজুরি তার প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয়ের মাত্র ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ মেটাতে সক্ষম।" বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তাফিজুর রহমানের মতে, "বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি যদি শ্রমিকের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতায় প্রতিফলিত না হয়, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধি টেকসই নয়।"


শ্রমিকের এই অধিকারের প্রশ্নে বাংলাদেশে সংগঠিত রাজনৈতিক আন্দোলনের একটি গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে। স্বাধীনতার পর শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের তাৎপর্য গভীরভাবে অনুধাবন করেছিলেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে শ্রমজীবী মানুষকে সংগঠিত না করলে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন সম্ভব নয়। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে এবং সেই চেতনাকে সাংগঠনিক রূপ দিতেই প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল — যা পরবর্তীকালে বাংলাদেশে শ্রমিক অধিকার আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছে। শ্রমিকবান্ধব প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান জাতীয় অর্থনীতিতে শ্রমিকের গুরুত্ব অনুধাবন করে এ খাতকে অগ্রাধিকার ভিত্তিক গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে শ্রমিকের কল্যাণ কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। এই দৃষ্টিভঙ্গি শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে যে আশার আলো জ্বালিয়েছে, তা আজকের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

প্রান্তিক কৃষি শ্রমিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য 'ফ্যামিলি কার্ড' বা পারিবারিক কার্ড ব্যবস্থার মাধ্যমে সুলভমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা সরাসরি শ্রমজীবী পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াচ্ছে। এছাড়া গ্রামাঞ্চলে খাল খনন ও পুনঃখনন কার্যক্রমের মাধ্যমে হাজার হাজার দিনমজুর ও গ্রামীণ শ্রমিকের হাতে কর্মসংস্থান ও নগদ অর্থ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এই উদ্যোগগুলো প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে শ্রমজীবী মানুষের জীবনে দ্রুত ও দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা সম্ভব।


মে দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শ্রমিকের ঘাম ও পরিশ্রমের বিনিময়েই গড়ে উঠেছে এই আধুনিক সভ্যতা। বাংলাদেশের প্রতিটি গার্মেন্টস কারখানার পোশাক, প্রতিটি ইটভাটার ইট, প্রতিটি রিকশাচালকের পরিশ্রম মিলিয়েই তৈরি হয় আমাদের জাতীয় সম্পদ। অথচ যাদের শ্রমে এই সম্পদ তৈরি, তারা রয়ে যান সবচেয়ে প্রান্তিক অবস্থানে। ইসলামের নির্দেশ, আন্তর্জাতিক শ্রম আইন এবং মানবিক বিবেক সবই একটি কথাই বলে: শ্রমিককে তাঁর প্রাপ্য দিন, সম্মান দিন, মানুষের মতো বাঁচতে দিন। হেমার্কেটের শহিদদের রক্তে লেখা এই শপথ আজও সমান প্রাসঙ্গিক। মে দিবস কেবল অতীতের স্মরণ নয়, এটি ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনাও। একটি ন্যায়সঙ্গত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির জন্য শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করা আমাদের অস্তিত্বের শর্ত।


লেখক- 
মানবাধিকার কর্মী
গবেষক ও পর্যবেক্ষক
ডেমোক্রেসি (উইদাউট বর্ডার্স)
প্যারিস, ফ্রান্স


 

সম্পাদকীয় :

Editor and Publisher-    Muhammad Nurul Islam

Executive Editor-  Kazi Habibur Rahman.  Managing Editor -  Eng. Mohammed Nazim Uddin
Head Office: Paris, State: Île-de-France
Dhaka office : House No-421 (1st Floor), Road No- 30, New DOHS, Mohakhali, Dhaka. Bangladesh.

Email: editor.eurobarta@gmail.com.

www.eurobarta.com সকল অধিকার সংরক্ষিত 

অফিস :